শিরোনাম

অন্তরালের এক বংশীযোদ্ধা

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : শনিবার, ডিসেম্বর ১৯, ২০২০ ৯:১১:৪৬ অপরাহ্ণ
অন্তরালের এক বংশীযোদ্ধা
অন্তরালের এক বংশীযোদ্ধা

চাষা জহির : ভালুকার অলিতে গলিতে ‘বন্দে মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে’ শীর্ষক সুর ভেসে আসলেই বুঝা যায় যে,সবার পরিচিত বাঁশিওয়ালা সালাম আসছে।ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার মল্লিকবাড়ি ইউনিয়নের বর্তা গ্রামে স্বাধীনতা যুদ্ধের এক যুগ আগে জন্মগ্রহণ করেন একালের লোকাল বংশীরাজ আব্দুস সালাম।বাল্যকাল থেকে বাঁশের বাঁশি তাকে আকুল করে তুলতো।কোথাও থেকে বাঁশির সুর ভেসে আসলে উদাস হয়ে তিনি ছুটে যেতেন বাঁশির টানে।সেই ভাললাগা ও বাঁশিপ্রীতি থেকেই প্রায় এক যুগ বিভিন্ন ওস্তাদের থেকে তালিম নিয়ে শুরু করেন বাঁশির সাথে মিতালী।আজ সেই মিতালীর বয়স অর্ধশতক পেরিয়েছে।তবু বংশীরাজ সালাম যেন সদ্য তরুণ বাঁশিওয়ালা,বাঁশিতে ফু দেওয়ার জোর কমেনি একচুলও।তার বাঁশি বাজানো দেখলে মনে হয়,এক নওযোয়ান বাঁশিতে মেতে উঠেছে যেন।কোন ক্লান্তি নেই বাঁশির,যেন বাঁশিই তার ধ্যাণজ্ঞান।একাত্তরে ছোট বলে যুদ্ধে যেতে পারেননি বলে সে দুঃখ তখন বাঁশি বাজিয়েই প্রকাশ করেছেন।বাঁশির রাজা বাঁশির মাধ্যমেই মানুষকে,প্রিয়তমাকে মায়াডোরে বেঁধে চলেছেন যেন। ভালুকা,ত্রিশাল,গফরগাঁও,শ্রীপুর ও সখিপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে সদর পর্যন্ত বাঁশি হাতে ছুটে বেড়ান তিনি।বাঁশিপ্রেমীরা তাকে ‘বংশী সালাম’ নামে চিনে থাকেন।ষাটের অধিক বয়সেও বাঁশি বিক্রি,বাঁশি বাজানো ও বাঁশি শেখানো নিয়েই পূর্ণ উদ্যমে লেগে আছেন।এ যাবৎ শ’খানেক শিষ্য ও লাখ খানেক বাঁশি তৈরি করেছেন প্রায়।নিজেই তৈরি করে থাকেন হরেক রকমের বাঁশি।বিধাতা যেন সুরের ঢালী তার হাতে ও বাঁশিতে ঢেলে দিয়েছেন।এত প্রেম বাঁশির জন্য,না দেখলে বিশ্বাস করা যাবেনা।বাঁশির জন্যই তিনি নন্দিত,বাঁশির জন্যই প্রবঞ্চিত। আধুনিক পেশার বৈচিত্র্যে সবাই যখন বড় বড় পেশায় ছুটছেন,তখন সালামের মত সংস্কৃতিযোদ্ধারা ধরে রেখেছেন বাংলা শেঁকড়ের বাঁশিকে।আধুনিক নাক ছিটকানো বাবুরা বাঁশি বিক্রি ও বাঁশি তৈরির এ পেশা নিয়ে তাচ্ছিল্য করলেও বংশীরাজ সালামদের কিছু যায় আসেনা,তারা যে আমাদের সুরের বাহক,আমাদের নির্মল সুরচিত্তের সঞ্চালক। আব্দুস সালামের সাথে আলাপ করে জানা যায় যে,তিনি আগে বাঁশি বিক্রি করে ভালভাবে চলতে পারলেও,এখন আর তেমন সুবিধা করতে পারছেননা।সারা দিনে দুই-তিনটা বাঁশি বিক্রি হয় মাত্র এবং উপার্জন যৎসামান্য।বাঁশির সোনালী দিন আধুনিকতার স্রোতে ভেসে যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।আক্ষেপ করে জানান,”বাঁশি বা সঙ্গীতের অন্যান্য শাখার অআ না জাইনাও অনেকে বাংলাদেশ টেলিভিশন বা রেডিওর তালিকাভুক্ত শিল্পী।আমি জেনারেল লাইনে লেহাপড়া করিনি বলে এবং তদবির-টাকা না থাহায় রাস্তায় বাঁশি লইয়া ঘুরতাছিতো ঘুরতাছি।আমার লাহান শেঁকড়ের শিল্পীদের লইয়া ভাবে কেডা!” প্রতিটি কথা থেকে যেন তার বেদনাত্মক সুর উগরে পড়ছে।আসলেইতো সালামদের জন্য কার এত মাথা ব্যথা! সরকারী-বেসরকারী ও ব্যক্তিপ্রদত্ত সুবিধাদি তো লেজুড়বাজ সংস্কৃতিকর্মীরাই পায় বেশি।সালামরা শুধু বাংলা শেঁকড়কে ভালবেসে বাঁশি তথা সুরকে আকড়ে রেখেছেন।এত বঞ্চনাতেও তাদের কারো প্রতি কোন রাগ নেই যেন,এক বুক দীর্ঘশ্বাস শুধু নিজেকে ঘিরেই।সরকার সহ সংশ্লিষ্টদের উচিত বংশীযোদ্ধা সালাম সহ দেশের শেঁকড়ের সংস্কৃতি লালনকারীদের সঠিক তদারকি করা।নচেৎ সালামদের অভিমানে আমাদের সংস্কৃতি একদিন পশ্চিমা ভারতীয় সংস্কৃতির আবডালে হারিয়ে যাবে।আমাদরকেও আধুনিকতা স্রোতে গাঁ না ভাসিয়ে মাটি ও মানুষের সুরের লালনকারীদেরকে মূল্যায়ন করতে হবে।মনে রাখতে হবে,সুর মনের অসুর ও সংকীর্ণতাকেও দূরে ঠেলে দিতে পারে।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Facebook Comments

সাম্প্রতিক খবর

Contact Us