শিরোনাম

কতদিন থাকবে করোনা?

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : শুক্রবার, অক্টোবর ২৮, ২০২২ ৭:২৬:৩০ অপরাহ্ণ

সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র (WHO) মহাপরিচালক টেড্রস আধানম গেব্রিয়াসুস বলেছেন, ‘বিশ্ব এখন কোভিড-১৯ মহামারি শেষ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত’। অবিলম্বে পৃথিবী থেকে বিদায় নিবে করোনা। ক’দিন আগে দেশের একটি বহুল প্রচারিত দৈনিকের শিরোনামে তাঁর বক্তব্য পড়ে আমার ভেতরটা আচমকা কেঁপে উঠেছিল। মোচড় দিয়ে উঠে প্রিয়তমা স্ত্রীকে হারানো আমার ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়ের শাখা-প্রশাখাগুলো। ভাবছিলাম, তাহলে বিশ্ববাসী পুনরায় উন্মুক্ত নীল আকাশে নিঃশঙ্ক চিত্তে ঘুরে বেড়াবে? দেশে দেশে আবার মাস্কবিহীন অবাধ বিচরণ শুরু হবে? আহ! দীর্ঘ নিরাপদ নিশ্বাসের অপেক্ষায় মানুষ কতকাল ধরে যেন মুখিয়ে আছে। আমিও চাই মানুষের সম্পূর্ণ মুখাবয়বের ফের উন্মোচন ঘটুক। মানুষগুলো কাছাকাছি থাক জলে, স্থলে এবং অন্তরীক্ষে। আবারও দশদিগন্তে ছড়িয়ে পড়ুক মানুষের সেই অন্তহীন মিছিল। হাজারো জিজ্ঞাসায় ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসুক শুধু মানুষ আর মানুষ।

গত তিনবছর ধরে বয়ে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত তথা অদৃশ্য করোনা-ঝড়ের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় বিশ্ব মানচিত্রের চিরচেনা ছবি। পৃথিবীর অসংখ্য জনপদে নেমে আসে অন্ধকারের মত বিভীষিকার দুঃস্বপ্ন। ভেঙে পড়ে বাজার অর্থনীতি, মুখথুবড়ে পড়ে পারিবারিক ও সামাজিক রীতিনীতি। আকস্মিক বিচ্ছিন্নতায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ে পরিবার ও সমাজজীবন। হাঁচি-কাশি এমনকি নিঃশ্বাস প্রশ্বাসেও মানুষের জীবন হয়ে ওঠে কঠোর নিয়ন্ত্রিত। প্রিয়জনকে হারিয়ে বাকরূদ্ধ, স্তম্ভিত হয়ে যায় মানুষ। অশ্রু শুকিয়ে শোকে কাতর ও পাথর হয়ে যায় নিকট স্বজনরা। আহা! কী নিঃসঙ্গতায়, কী অসহায়ত্ব আর একাকীত্বের ভেতর দিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে অগুনতি কীর্তিমানকে। অন্তিমকালে বাবা ছেলের মুখ দেখতে পায়নি, মা সন্তানের জন্য প্রার্থনা করতে করতে চোখ বুজে পরপারে পাড়ি জমায়। জ্ঞাতিগোষ্ঠী, বন্ধু-বান্ধব, আপনজন থাকা সত্বেও বেওয়ারিশ লাশ হয়ে পড়ে থাকে হাসপাতালের আঙিনায়। দেখার কেউ নেই। স্বার্থপরের মতন সকলই আশ্রয় নেয় ঘরের কোণে। কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে মৃতের সৎকারের দায়িত্ব পালন করে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম এবং একাধিক ধর্মীয় সামাজিক সংগঠন। চিকিৎসকগণ দিশেহারা, ভীতসন্ত্রস্ত। কেউ কেউ চাকরির মায়াকে তুচ্ছজ্ঞান করে চারদেয়ালের ভেতরেই বাঁচতে চেয়েছেন। লকডাউনে গৃহবন্দীত্ব, দরজা জানালায় তালা, দৈনিক পত্রিকাসহ বাইরের বস্তুর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ। শুনেছি, দাপ্তরিক নথিপত্রও দরজার বাইরে ২৪ ঘণ্টার ডিটেনশন শেষে ছাড়া পেয়েছে। কত যে বিচিত্র অভিজ্ঞতার এই বেঁচে থাকা। ঘরে অক্সিজেন সিলিন্ডার, হাতে স্যানিটাইজার, মুখে মাস্কের কঠিন বন্ধনী। পিপিই’র (পিপিপি নয়) নিরবচ্ছিন্ন সাপ্লাই নিয়ে তুলকালাম বেঁধে যায় রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বত্র। ডিপো’র অভ্যন্তরীন প্রশাসনে রাতারাতি পরিবর্তন, বদলি আতঙ্কে কর্মচারি, মিডিয়া পাড়া জুড়েও নিদ্রাহীন রজনী। টিকা (vaccine) আমদানি, টিকা তৈরির প্রস্তুতি, টিকার ট্রায়াল, টিকার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার, টিকার রাজনীতি, টিকার অর্থনীতি কতকিছু ঘটে গেল স্বদেশে এবং বিশ্বব্যাপী। প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার যুগে এবং বিজ্ঞানের আকাশছোঁয়া জয়জয়ন্তীতেও মানুষ কিভাবে দিকবিদিক জ্ঞানশুন্য হয়ে পড়ে, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায় তার চাক্ষুষ সাক্ষী হয়ে থাকলাম কেবল আমরা এবং আমাদের সময়ের এখনকার জীবিত প্রজন্ম।

২০২০ সালের শুরুতে এশিয়ার মহা শক্তিধর দেশ চীনের ওহান প্রদেশে উৎপত্তি হয়ে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এই প্রাণঘাতী ভাইরাস। মনে হয়, নিমিষেই এ সংক্রমণ গোটা পৃথিবীকে আক্রান্ত করে ফেলে। এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকাসহ উত্তরমেরু থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত প্রকম্পিত হয়ে উঠে মানব সভ্যতা। এ যাবৎ বাংলাদেশে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। সারা বিশ্বে ৬৫ লক্ষ ৫০ হাজারের কাছাকাছি। ভারত, চীন, ইতালি বা ব্রাজিলে লাশের মিছিলের মর্মান্তিক চিত্র দু’চোখের আলোয় এখনো স্থির হয়ে আছে। স্বনাগরিকের জীবন রক্ষার্থে পৃথিবীর অনেক দেশের উচ্চ আদালত সরকারের ওপর স্বতঃপ্রণোদিত (sue moto) নির্দেশনা জারী করেছেন। উৎপাদনকারী দেশগুলো নিজের দেশের চাহিদা মেটানোর পূর্বে একডোজ টিকাও রপ্তানি করতে পারবে না। আরও কত কাণ্ড। বিশ্বফুটবলের কিংবদন্তি দিয়াগো ম্যারাডোনাও করোনা ভাইরাসের শিকার হয়ে পৃথিবী ছাড়েন। তাঁর কালজয়ী ঈশ্বরের হাত দিয়ে গোল করার রিপ্লেতে আজও মানুষ বিস্ময় প্রকাশ করে। কী বেদনার্ত, কী মানবেতর সময়ের করুণ গাথা অবলোকন করেছিল মানব সভ্যতা– তা এ মুহূর্তে বর্ণনাতীত।
করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের প্রথম দিকটায় উন্নত দুনিয়ার চিকিৎসাবিজ্ঞানীরাও বিব্রতবোধ করেছিলেন। এ যেন হোটচ খাওয়ার মত ঘটনা। তবে অক্সফোর্ডের বিশেষজ্ঞগণ ক্রমাগত ট্রায়ালের মধ্য দিয়ে আশার বাণী শুনিয়ে গেছেন। বাংলাদেশেও চায়নিজ কোম্পানিসহ হিউম্যান ট্রায়ালের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিল একাধিক বিদেশি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। মনে হচ্ছিল, পৃথিবী এই প্রথম এক এবং অভিন্ন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে কোভিড-১৯ ভাইরাসের মুখোমুখি দাঁড়ায়। যা অনেক দিন পরে বিশ্ববাসী দেখেছিল। তবে যথাযথ প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসই সাফল্য এনে দেয়। কেননা এ চাওয়া ছিল জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের এবং নিরঙ্কুশভাবে সর্বজনীন। এ ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র নেতৃত্ব ও ভূমিকা ছিল অনন্য। সংস্থাটি বিশ্ববাসীর কাছে সত্যিকারের আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। আমাদের নিজের দেশেও করোনার প্রতিষেধক টিকা তৈরির প্রস্তুতি নিতে যাচ্ছিল বাংলাদেশ সরকার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’র এমন ঘোষণা উদ্বিগ্ন জাতিকে প্রাণিত করেছিল। সেসময় বেসরকারি উদ্যোগে ‘গ্লোব বায়োটেক’ নামের একটি দেশীয় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি একের পর এক ট্রায়ালে অবতীর্ণ হয়ে সাড়া ফেলেছিল। তারা Ban-Covid নাম দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও এক পর্যায়ে নাম পরিবর্তন করে টিকার নাম Banga-Vax রাখেন। জানা যায়, এদের কার্যক্রম এখনো অব্যাহত আছে। হয়তো অচিরেই শতভাগ সফলতা ধরা দিবে।

আমাদের মাতৃভূমিতেও করোনাকালে তথা কোভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে যান অসংখ্য খ্যাতিমান মনীষী। এ তালিকাও একেবারে ছোট-খাটো নয়। এদের কি বাঙালি জাতি খুব তাড়াতাড়ি ভুলে যেতে পারে? অবশ্যই না। আজ এখানে আমাদের ক’জন ইতিহাস সৃষ্টিকারী সন্তানকে আরেকবার অশ্রুসজল হয়ে স্মরণ করতে পারি–

জাতীয় অধ্যাপক, সংবিধানের অনুবাদক ড. আনিসুজ্জামান, ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, খ্যাতিমান ডাঃ কর্ণেল (অবঃ) মনিরুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যানসেলর অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ, ভাষাবিদ কামাল লোহানী, অধ্যাপক, লেখক ও শিল্পবোদ্ধা ড. বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, লেখক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, সাবেক সিভিল সার্ভেন্ট ও মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার আসাদুজ্জামান, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুক্তিযোদ্ধা ড. সা’দত হোসাইন, সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, সাবেক মন্ত্রী এড.সাহারা খাতুন, শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, অধ্যাপিকা মমতাজ বেগম, আলহাজ্ব মোঃ মকবুল হোসেন, প্রতিরক্ষা সচিব আবদুল্লাহ আল মহসীন চৌধুরী, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তৎকালীন সচিবের সহধর্মীনি কামরুন্নাহার জেবু, সংগীত শিল্পী ও সুরকার আজাদ রহমান, ফকির আলমগীর, এন্ড্রু কিশোর, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী মিতা হক, বরেণ্য অভিনেতা আলী যাকের, স্বনামধন্য অভিনেত্রী কবরী, অভিনেতা আবদুল কাদের, শিল্পপতি নূরুল ইসলাম বাবুল, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী, চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর, টিভি ব্যক্তিত্ব মোস্তফা কামাল সৈয়দসহ আরো অনেক। যাদের নাম অজ্ঞাত এবং অজানা।

আজকাল প্রায়শই আমি এক কল্পলোকের স্বপ্নের মধ্যে পড়ে থাকি। যাকে বলে ঘোরলাগা স্বপ্ন। তখন কল্পনার রথে চড়ে মহাবিশ্বের সকল অদৃশ্য অগম্য স্থানেও আমার অবাধ বিচরণ চলে। আমার কল্পনাবিলাসের যেন অন্ত নেই। মনে মনে বলি, করোনা ভাইরাসের শিকার হয়ে অকালে চলে যাওয়া মানুষগুলো হয়তো আবার আমাদের পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। তাদের চিরবিদায় হয়নি। মহামারিতে মৃতরা নাকি নিষ্পাপ দেবতুল্য।

আমি শোনার জন্য অধীর হয়ে থাকি, একদিন এক প্রসন্ন সকালে অতি আকস্মিকভাবে বিশ্বের চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা ঘোষণা দিবেন, কোভিড-১৯ এ মৃত্যুবরণকারীরা পুনর্জীবন পাবেন। কারণ ওটা আসলে তাঁদের প্রকৃত মৃত্যু ছিল না। তাদেরকে অত্যাধুনিক চিকিৎসা দিলেই দেহে প্রাণ ফিরে আসবে। বলুন তো, কী তাজ্জব ব্যাপার! বুঝি না, কেন এমন উদ্ভট ভাবনাবিলাস আমাকে সারাক্ষণ তাড়িয়ে বেড়ায়? আসলে আমি কি বেঁচে আছি?

লেখক: গল্পকার, প্রাবন্ধিক এবং সাবেক স্বাস্থ্য সচিব।

সূত্র- বিডি প্রতিদিন/ ওয়াসিফ

Spread the love
Facebook Comments

সাম্প্রতিক খবর

Contact Us