শিরোনাম

করোনায় ছন্দহারা মেট্রোরেল

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : মঙ্গলবার, অক্টোবর ২০, ২০২০ ৪:৩২:০১ অপরাহ্ণ
করোনায় ছন্দহারা মেট্রোরেল
করোনায় ছন্দহারা মেট্রোরেল

মেট্রোরেলের উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশ বাস্তবায়ন করছে এই প্রতিষ্ঠান। সময় বাড়ানোর আবেদন করলেও প্রকল্পে ব্যয় বাড়বে না বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ইতিমধ্যে করোনায় যে ক্ষতি হয়েছে তাতে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে কমলাপুর পর্যন্ত পুরো প্রকল্প উদ্বোধন করা সম্ভব হবে না। তাই নির্ধারিত সময়ে অন্তত আগারগাঁও পর্যন্ত অংশে রেল চালুর চিন্তা করা হচ্ছে। এই অংশে এ পর্যন্ত ৭৭ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্পের সার্বিক কাজের অগ্রগতি ৫০ ভাগের মতো। করোনার কারণে প্রথমে দুই মাস কাজ প্রায় বন্ধ ছিল। পরে ধীরে ধীরে কার্যক্রম শুরু করা হয়। এখন কিছুটা গতি ফিরেছে কাজে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত পুরো অংশেই কর্মীদের কাজ করতে দেখা যাচ্ছে। দিনেরাতে কাজ চললেও তুলনামূলক কম শ্রমিক ব্যবহার করা হচ্ছে করোনা ঝুঁকির কারণে। এক সঙ্গে অনেক শ্রমিক কাজ করতে পারছেন না এক স্থানে। বর্তমানে উত্তরা, মিরপুরের পল্লবী, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া স্টেশনের সংযোগ ছাদ নির্মাণের কাজ চলছে। এ অংশে রেল ট্র্যাক ও বৈদ্যুতিক লাইন স্থাপনের কাজও চলছে।
এ ছাড়া আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশে পিয়ার স্থাপনের কাজ প্রায় শেষের দিকে। কোথাও পিয়ার ক্যাপ বসানো হচ্ছে। এরপর বসবে ভায়াডাক্ট। এ ছাড়া উত্তরা উত্তর, উত্তরা দক্ষিণ এবং উত্তরা সেন্টার স্টেশনের প্লাটফর্ম নির্মাণের কাজ চলছে। ডিএমটিসিএল এমআরটি লাইন-৬ এর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, লকডাউনে কাজ সাময়িক স্থগিত থাকলেও লকডাউন তুলে দেয়ার পর জুন মাস থেকে কাজ শুরু হয়। শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও চিকিৎসার স্বার্থে ইতিমধ্যে দু’টি ফিল্ড হাসপাতাল চালু হয়েছে। তবে প্রকল্পে চীন, জাপানিসহ বিদেশি প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের অনেকে নিজ নিজ দেশে অবস্থান করে পরামর্শ দিচ্ছেন। কেউ কেউ আবার কাজে যোগ দিয়েছেন।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগে যেমন একটি পিয়ারে ১০ থেকে ১৫ জন লোক একসঙ্গে কাজ করতেন। এখন তিন থেকে চার জনের বেশি শ্রমিককে কাজ করতে দেয়া হচ্ছে না। এ কারণে কাজ চলমান থাকলেও গতি আগের মতো নেই। কাজের সময় দীর্ঘায়িত হওয়ায় প্রকল্প এলাকার মানুষের দুর্ভোগও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। পুরো প্রকল্প এলাকার সড়ক সংকোচন করে কাজ করায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া সড়ক সংস্কার না করায় খানাখন্দ ও ধুলা ময়লায় পথ চলতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। এসব দুর্ভোগ লাগবে মেট্রোরেল বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব থাকলেও তা পালন হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।
রাজধানীর প্রথম মেট্রোরেল লাইন-৬ এর মোট আটটি প্যাকেজের মধ্যে ছয়টিতে কাজ চলছে। বর্তমানে এই প্রকল্পের বৈদ্যুতিক লাইন স্থাপন, স্টেশন নির্মাণসহ অন্যান্য কাজ চলমান। উত্তরা তৃতীয় পর্ব থেকে মতিঝিলের বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত পুরো পথের দূরত্ব ২০ দশমিক ১০ কিলোমিটার। মিরপুর পল্লবী, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, সংসদ ভবন, ফার্মগেট, শাহবাগ, দোয়েল চত্বর ও প্রেস ক্লাব হয়ে মতিঝিল যাবে। পথে হবে ১৬টি স্টেশন। এ রুটের দৈর্ঘ্য এক কিলোমিটারেরও বেশি বাড়িয়ে তা কমলাপুর পর্যন্ত নেয়ার পরিকল্পনা যুক্ত হয় পরবর্তীতে। দৈর্ঘ্য বাড়লেও এতে ব্যয় বাড়বে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মেট্রোরেল প্রকল্পের সময় এবং ব্যয় বাড়বে কি না জানতে চাইলে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম.এ.এন ছিদ্দিক  বলেন, ২০২১ সালে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে তারা এগোচ্ছেন। প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোরও কোনো সুযোগ নেই। কাজের গতি সম্পর্কে তিনি বলেন, করোনার আগে মেট্রোরেল প্রকল্পে কাজের যে গতি ছিল আমরা এখন প্রায়ই সেই গতিতে চলে এসেছি। এখানে যে মাঠ প্রকৌশলী আছেন তার উপরে যে অংশটি তারা কিন্তু সবাই বিদেশি। এখানে কিন্তু পুরোপুরিভাবে স্বাস্থ্যবিধি এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে কাজ করতে হয়। যতটুকু কাজ করা সম্ভব তার প্রায় শতভাগ কাজ চলছে। সঠিক সময়ে কাজ শেষ করতে রাতে আমরা দুই শিফটে কাজ করাচ্ছি। দলে দলে ভাগ করেছি যাতে করোনা ছড়িয়ে না পড়ে। দলের সংখ্যাটা আমরা বৃদ্ধি করে দিয়েছি। প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রকল্প এমআরটি লাইন-৬ এ আমরা প্রায় ৫০ ভাগের বেশি কাজ শেষ করেছি। দিয়াবাড়ি থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত প্রায় ৭৭ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এ অংশের কাজ প্রায় ৪৪ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে।
প্রকল্পের বিষয়ে সাবেক বিদ্যুৎ সচিব ও বড় প্রকল্প বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, সময় বাড়লে অবশ্যই ব্যয় বাড়বে। এটা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। আমাদের এখানে প্রকল্প বাস্তবায়নে অদক্ষতা রয়েছে। আমাদের দেশে প্রকল্পের কাজগুলো বুঝে নেয়ার সামর্থ বা ক্যাপাসিটি নেই। দেরি হওয়ার এটাও একটি কারণ। করোনার কারণে তো এতে আরো প্রভাব পড়বে। এখানে বিদেশি পরামর্শক, দেশি টেকনেশিয়ান রয়েছেন। লকডাউনে যাতায়াত খরচ রয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব এ বিষয়ে বলেন, সময় বাড়লে ব্যয় বাড়বে। এটা স্বাভাবিক। একটি প্রকল্পে যখন সময় বেড়ে যায় তখন তার কিছু কিছু ‘কস্ট অব অপারেশন্স’ও বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, করোনার কারণে ব্যয় বাড়েনি এমন কোনো খাত পাওয়া যাবে? ছোট দোকানদার থেকে শুরু করে বড় ব্যবসায়ী প্রত্যেকের ব্যয় বেড়েছে। আর এখনতো স্থগিত হয়ে আছে। আউটপুট নেই। কিন্তু প্রকল্পের লোকগুলোকে রাখতে হচ্ছে, সমস্ত স্থাপনা ব্যয় নির্বাহ করতে হচ্ছে। এগুলো দেখার পরেও যদি কেউ বলে খরচ বাড়বে না, এটা টিক না। দ্বিতীয়ত, সময় যখন বেড়ে যায় তখন স্বাভাবিক নিয়মেই প্রকল্পের অন্যান্য স্থায়ী খরচগুলো হতেই থাকে। স্বাস্থ্য সুরক্ষা, ব্যক্তি সুরক্ষা ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করতে খরচ বাড়বে।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Facebook Comments

সাম্প্রতিক খবর