শিরোনাম

ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না, ১১৫০ টাকার ফি আদায় হয় ২০ হাজার থেকে এক লাখ

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : রবিবার, ডিসেম্বর ২০, ২০২০ ১:১৯:৪৮ অপরাহ্ণ
ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না, ১১৫০ টাকার ফি আদায় হয় ২০ হাজার থেকে এক লাখ
ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না, ১১৫০ টাকার ফি আদায় হয় ২০ হাজার থেকে এক লাখ

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের দুটি ভূমি অফিসে ঘুষ না দিলে ফাইল নড়ে না বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগীরা। এতে প্রতিনিয়তই বিপাকে পড়ছেন সেবা নিতে আশা গ্রাহকরা। ওই সকল ভূমি অফিসে নিয়োজিত দালাল এবং ওমেদারদের দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে থাকেন ভূমি কর্মকর্তারা। ঘুষ না দিলে মাসের পর মাস ফাইল নিয়ে কড়া নাড়তে হয় তাদের দরজায়। বিভিন্ন অজুহাতে আদায় করা হয় মোটা অংকের উৎকোচ। এই অবস্থা চলছে মাসের পর মাস। দেখার যেন কেউ নেই।

আজ রবিবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সিদ্ধিরগঞ্জ ভূমি কার্যালয়ের ভেতরে ও বাইরে অর্ধশতাধিক লোক অপেক্ষা করছে। এই কার্যালয়ের ভূমি সহকারী কর্মকর্তার দায়িত্বে রয়েছেন আরিফ হোসেন নামে এক ব্যক্তি। তিনি পাইনাদী নতুন মহল্লা থেকে খারিজ করতে আসা জালাল উদ্দীনের সঙ্গে উচ্চস্বরে বলছেন, লাখ টাকার জমি কিনেছেন,আর ওমেদারদের এক হাজার টাকা বকশিস দিতে কষ্ট লাগে। ভূমি কর্মকর্তার এ ধরনের আচরণে উপস্থিত সকলে হতভম্ব হয়ে পড়েন।

ভুক্তভোগী জালাল উদ্দীন জানান, আমি দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে ছিলাম। বিদেশ থেকে এসে আমার ক্রয়কৃত ১ শতাংশ জমি খারিজ করার জন্য ২০ হাজার টাকা ঘুষ দেওয়ার পরও দুই মাসের মধ্যে খারিজের কাগজ হাতে পাইনি। জানি না কবে খারিজের কাগজ পাবো।

মিজমিজি চৌধুরীপাড়া থেকে আসা আজহারুল ইসলাম ও জাকির হোসেন নামের দুই ব্যক্তি জানান, টাকা না দিলে এই অফিসের পিয়ন থেকে শুরু করে নায়েব পর্যন্ত ফাইলে হাত দেন না। টাকা দিলে কাগজ ঠিক থাকে। টাকা না দিলে কাগজ বেঠিক হয়ে যায়। এক প্রকার প্রকাশ্যেই ঘুষ বাণিজ্যে মেতে উঠেছেন সেবার নামে এসকল ভূমি কর্মকার্তারা।

সিদ্ধিরগঞ্জ ভূমি অফিসের সামনে কনফেকশনায়ী দোকানদার জাকির হোসেন বলেন, এক থেকে পাঁচ শতাংশ জায়গায় জন্য ২০ হাজার, পাঁচ থেকে দশ শতাংশ জায়গার জন্য ৪০ হাজার, দশ থেকে বিশ শতাংশ জায়গার জন্য ৬০ হাজার টাকা খারিজ বাবদ নেয়া হয় এই অফিসে। কাগজপত্র ঠিক না থাকলে টাকার অংক দ্বিগুণ থেকে চারগুণ পর্যন্ত আদায় করেন তারা।

সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল ভূমি কার্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে একই দৃশ্য চোখে পড়ে। এই কার্যালয়ের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন কামাল হোসেন ও ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা হিসেবে রয়েছেন মজিবুর রহমান।

কথা হয় খরিজ করতে আসা ঝালকুড়ি এলাকার বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, মোটা অঙ্কের টাকা না দিলে কোনরকম সেবা পান না তারা। এই অফিসের কর্মকর্তারা মুনিব আর আমরা তাদের গোলাম বনে গেছি। এ বিষয়ে দুর্নীতিবাজ ভুমিকর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি।

কার্যালয়ের সামনে জামাল হোসেন নামে এক দলিল লেখক জানান, সরকারিভাবে খারিজ বাবদ ১১৫০ টাকা নেয়ার নিয়ম থাকলেও তারা ২০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত খারিজ বাবদ আদায় করে থাকেন। সাধারণ মানুষ তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন।

অনুসন্ধান চালিয়ে জানা যায়, সরকারি নীতিমালা অমান্য করে সিদ্ধিরগঞ্জ ভূমি কার্যালয়ে রেজাউল করীম নামে এক ওমেদার একই কার্যালয়ে ৮ বছর, দবির উদ্দিন বিভিন্ন কার্যালয়ে ১০ বছর, হাসান মিয়া ৬ বছর, বশির উদ্দিন ৬ বছর, গোদনাইল ভুমি অফিসে শরীফ হোসেন ১০ বছর, ওমর ফারুক ৫ বছর, সুমন মিয়া ৪ বছর ও লোকমান হোসেন নামে ওমেদার দির্ঘদিন ধরে চাকরি করছেন। ওমেদার শরীফ হোসেন ও রেজাউল করীম ভূমি কর্মকর্তাদের পছন্দের পাত্র হওয়ায় তারা দুজন লাখ লাখ টাকার মালিক বনে গেছেন।

ভূমি কর্মকর্তারা যেখানে বদলি হন সেই কার্যালয়ে তাদের পছন্দের ওমেদারদের নিয়ে যান। শর্ত একটাই কাড়ি কাড়ি টাকা কামাতে হবে। ওমেদারদের দিয়ে কাজের চাহিদা অনুযায়ী ঘুষ বাণিজ্যে মেতে উঠেন ওই সকল ভুমি কার্যালয়ের কর্মকর্তারা, এমনটাই অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

অভিযোগে প্রকাশ, সিদ্ধিরগঞ্জ ভূমি অফিসের ভুমি সহকারী কর্মকর্তা আরিফ হোসেন গোদনাইল ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা কামাল হোসেন অবৈধভাবে বহু টাকার মালিক বনে গেছেন। অনুসন্ধানে তাদের সম্পত্তি বেরিয়ে আসবে বলে মনে করেন সচেতন মহল। কামাল হোসেন দীর্ঘদিন সিদ্ধিরগঞ্জ ভূমি কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করার পর পুনরায় একই থানার গোদনাইল ভূমি কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করছেন।

সিদ্ধিরগঞ্জ ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা আরিফ হোসেন  বলেন, আমি কোনো দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নই। আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ চালানো হচ্ছে।

গোদনাইল ভূমি অফিসের ভুমি সহকারী কর্মকর্তা কামাল হোসেন  জানান, অবৈধভাবে কোনো সম্পদ করিনি। ওমেদারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অফিসের কাজের সুবিধার্থে তাদের কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

সিদ্ধিরগঞ্জ সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) রেজা মাসুম প্রধান  জনান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ভূমি অফিসকে ঘুষ ও দুর্নীতিমুক্ত রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি। কোনো কর্মকর্তা ও ওমেদার দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দীন  জানান, ভূমি কার্যালয়ের দুর্নীতি ও অনিয়ম কোনভাবেই মেনে নেওয়া যাবে না। যদি কোনো কর্মকর্তা দুর্নীতিতে জড়িয়ে থাকেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Facebook Comments

সাম্প্রতিক খবর

Contact Us