শিরোনাম

চিকিৎসার নামে আয়েশী জীবন

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : সোমবার, সেপ্টেম্বর ৭, ২০২০ ৬:৩৮:৩৪ অপরাহ্ণ
আমার সংবাদ
আমার সংবাদ

শারীরিকভাবে তেমন অসুস্থ নন। নেই অসুস্থতার লক্ষণও। প্যাথলজিক্যাল রিপোর্টও স্বাভাবিক। তবু নানা অসুস্থতার অজুহাতে হাসপাতালে ভর্তি। কাটাচ্ছেন আয়েশী জীবন। নিয়মিত খাচ্ছেন উন্নতমানের খাবার।

কোনো আইনি বাধা ছাড়াই দেখা পাচ্ছেন পরিবারেরও। দুর্নীতির দায়ে গ্রেপ্তার প্রভাবশালী আসামিদের আধিকাংশই নানা ছুতোয় হাসপাতালে কাটাচ্ছেন সপ্তাহ, মাস থেকে বছর। দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়েও তাদের রোগ সারছে না।

ফলে হাসপাতালও ছাড়তে হচ্ছে না। আছেন-ও বেশ শান্তিতে। দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত এমন অন্তত ৮০ জন  হাসপাতালে আয়েশী জীবন কাটাচ্ছেন। তারা আবার হাসপাতালেও আছেন অনেকটা ভিআইপি মর্যাদায়। কারো বাসা থেকে স্ত্রীর রান্না করা খাবার আসছে, কারো ‘বাইরে থেকে’ আসছে ব্যবহার্য নানা জিনিসপত্র।

কেউ কেউ হাসপাতালে থেকেই টেলিফোন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কারাগারের বাইরের লোকদের সঙ্গে রক্ষা করছেন স্বাভাবিক যোগাযোগ। চালাচ্ছেন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবার। সময় কাটাচ্ছেন স্বজন বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে খোশগল্প করে।

তবে চিকিৎসা শেষে জেলে ফেরাতে কারাগার থেকে বারবার তাগিদ দিলেও হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের ‘ছাড়পত্র’ না পাওয়ায় তাদের কারাগারেও নেয়া যাচ্ছে না। জি কে শামীম, ইসমাঈল হোসেন সম্রাট, ডেসটিনির রফিকুল আমিন, যুবলীগ নেতা খালেদ, মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার আসামি এনএসআইয়ের সাবেক ডিজি ওহিদুল হকসহ শতাধিক আসামি বা সাজাপ্রাপ্ত বন্দি চিকিৎসার জন্য কারাগারের বাইরে হাসপাতালে আছেন।

এর মধ্যে কেউ কেউ মাসের পর মাস, বছরের পর বছর টানা হাসপাতালে থাকছেন। দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকতেও ঢালছেন কাড়ি কাড়ি টাকা। আর এসব টাকা যাচ্ছে কারাগার ও হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের পকেটে।

এর মধ্যে ডেসটিনির রফিকুল আমিনকে হাসপাতাল থেকে কারাগারে ফেরাতে ২৭ বার চিঠি দিয়েও কাজ হয়নি। প্রায় এক বছর পাঁচ  মাস ধরে তিনি হাসপাতালের একটি কক্ষে চিকিৎসাধীন আছেন। তবে তার স্বজন ও কারাগারের চিকিৎসকদের দাবি, তিনি অসুস্থ বলেই কারাগারা পাঠানো হচ্ছে না।

কারাগার ছেড়ে অযথা হাসপাতালে থাকা নিয়ে বিশ্লেষকরা বলেন, নানা অসুখের মিথ্যা তথ্য দিয়ে দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকা আসামিরা প্রত্যেকেই দুর্নীতি দমন কমিশন দায়েরকৃত মামলার আসামি।

তাদের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগই হচ্ছে তারা জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের মালিক ও বিদেশে টাকা পাচারকারী এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা নামে-বেনামে অর্জন করেছেন বিপুল অংকের অবৈধ সম্পদ।

এ অবৈধ অর্থসম্পদ তারা ব্যয় করেন বন্দি থেকেও আয়েশী জীবন যাপনের পেছনে। তাদের দাবি, কারাগারের এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী, এমনকি কারা হাসপাতাল এবং কারাগারের বাইরে হাসপাতালের ডাক্তারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে চিকিৎসার নামে কারাগারের বাইরে অবস্থান করছেন।

কখনো চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন ভিআইপি মর্যাদায়। কারাগারের বাইরে অবস্থানকালে কথিত এই বন্দিদের ওপর নজরদারি ব্যবস্থা যেমন শিথিল, তেমনি ব্যয় হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ ও জনবল। অথচ গ্রেপ্তার এবং কারাগারে প্রেরণের পরবর্তী অবস্থা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই দুদকের। এ ক্ষেত্রে তারা দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন।

এদিকে হাসপাতাল এবং কারাগার সূত্রে জানা যায়, এ মুহূর্তে সারা দেশে অন্তত ৮০ জন দুর্নীতি মামলার আসামি নানা শারীরিক সমস্যা দেখিয়ে হাসপাতালে রয়েছেন। এর মধ্যে ২০ জনই রয়েছেন ‘ভিআইপি’ সুবিধা নিয়ে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে তারা চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঢাকার বাইরে অন্তত ৬০ আসামি অসুস্থতার অজুহাতে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। কিন্তু তাদের চিকিৎসা কবে শেষ হবে কেউ বলতে পারছেন না।

আলোচিত আসামিদের মধ্যে ক্যাসিনোকান্ডে গ্রেপ্তার হওয়া ইসমাঈল চৌধুরী সম্রাট, জি কে শামীম, ডেসটিনির মোহাম্মদ রফিকুল আমিন রয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ)। এদের মধ্যে সম্রাট বসবাস করছেন হাসপাতালের একটি কেবিনে।

জি কে শামীম এবং রফিকুল আমিন আছেন একই হাসপাতালের প্রিজন সেলে। মাজহার আলী শ্রাবণ নামে আরেকজন আসামি রয়েছেন প্রিজন সেলে। সোহাগ হোসেন ও মিলন নামের দু’জন আসামি রয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে।

শহিদুল ইসলাম, মনিরুল ইসলাম মুন্না কাজী ও করিম আকন্দ রয়েছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। মনজুর আহমেদ, হারুন ও মালিকান্দা চিকিৎসাধীন রয়েছেন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এদের মধ্যে চিকিৎসাধীন জি কে শামীমের একটি হাত ভাঙা বলে জানা গেছে। তার হাতে মেডিকেল ডিভাইস লাগানো রয়েছে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও অ্যাজমার সমস্যাও রয়েছে তার।

তবে অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, হাসপাতালের প্রিজন সেলে জি কে শামীম সুস্থই রয়েছেন। তার খাবার এবং ওষুধ আসছে হাসপাতালের বাইরে থেকে। গত বছর ২০ সেপ্টেম্বর তিনি নিকেতনের নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার হন। টানা চারমাস তিনি বিএসএমএমইউতেই রয়েছেন।

হাসপাতালে তাদের চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসকরা জানান, করোনার ভুয়া সাটিফিকেট দেয়া রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক সাহেদ সাধারণ সমস্যায় হাসপাতালে গেলেও তাকে চিকিৎসা শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে সম্রাট গুরুতর ইনফেকশনের কারণে বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। গত বছর ২৪ নভেম্বর থেকে তিনি এখানেই রয়েছেন।

তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের অনুমোদন থাকলেও আনা যায়নি দুদকে। ৯ মাস আগে আদালত সম্রাটের রিমান্ড মঞ্জুর করলেও তাকে রিমান্ডে নেয়া যায়নি। ২৫ আগস্ট দুদকের কয়েকজন কর্মকর্তা হাসপাতালে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আসেন।

পরে দুদক থেকে জানানো হয়, অবৈধ সম্পদ অর্জন মামলায় সম্রাটকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ডেসটিনির মোহাম্মদ রফিকুল আমিনের রয়েছে কিডনি সমস্যা। ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের পুরনো সমস্যাও রয়েছে তার। দুদকের মামলায় ২০১২ সালের ১৭ অক্টোবর গ্রেপ্তার হন ডেসটিনি-২০০০ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমিন।

গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি খুব কম সময়ই কারাগারে ছিলেন। ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার জন্য তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। সর্বশেষ গত বছর ১১ মার্চ বিএসএমইউতে তাকে ভর্তি করা হয়। সেই থেকে তিনি এ হাসপাতালের প্রিজন সেলে রয়েছেন।

কারা সূত্র আরও জানায়, এর চেয়ে অনেক বেশি অসুস্থ কারাবন্দিও কারাগারে চিকিৎসা নিচ্ছেন। প্রভাবশালী ও বিত্তশালী দুর্নীতি মামলার আসামিরাই কেবল দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন।

এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আসলে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটা নিয়মিত ঘটনা হয়ে যাচ্ছে। দুর্নীতির দায়ে কারাগারে থাকার কথা থাকলেও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে তারা হাসপাতালে থাকছেন। কারা প্রশাসনের লোকদের যোগসাজশ ছাড়া এটা সম্ভব নয়।

তাই সুবিধাভোগী অপরাধীর পাশাপাশি যারা তাকে সুবিধা দেয়ার সঙ্গে জড়িত, তাদের সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। দুর্নীতি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গিয়েও দুর্নীতি করছে অভিযুক্তরা। তাদের বিষয়ে বিশেষ মনিটরিং থাকা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, আসামি গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানোর পরও দুদকের দায়-দায়িত্ব রয়েছে। দুর্নীতি মামলার বিচারের পর রায় কার্যকর হলো কি-না সেটি দুদকের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

দুর্নীতি মামলার আসামিরা কারাগারে গিয়েও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে দুদক তা নিয়েও অনুসন্ধান চালাতে পারে। দুর্নীতির সঙ্গে কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশ আছে কি-না তা খতিয়ে দেখাও দুদকের দায়িত্ব।

এ বিষয়ে এক প্রশ্নে সংস্থার সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত সাংবাদিকদের বলেন, গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হলে ওই আসামি কারাবিধির আওতায় চলে যায়। সেখানে আসামির অ্যাক্টিভিটিস কারাবিধি অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে দুদকের তেমন কিছু করার নেই বললেই চলে। তবে সংশ্লিষ্ট কারাকর্মকর্তারাও এর দায় নিতে নারাজ। তারা দায় চাপাচ্ছেন চিকিৎসকদের ঘাঁড়ে।

এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মাহবুবুল ইসলাম বলেন, ‘বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে বন্দিরা কারা হাসপাতাল এবং বাইরের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি আছেন। কারা হাসপাতালের ডাক্তারদের পরামর্শেই তাদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতাল থেকে কারাগারে ফেরত আনতেও হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের পরামর্শে আনতে হয়।

এক্ষেত্রে কারা কর্তৃপক্ষের কিছুই করার নেই। বিধি অনুসারে দুই সপ্তাহ পর সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি লেখে কারা কর্তৃপক্ষ। অসুস্থ হয়ে ভর্তি হওয়া কোনো কয়েদি সুস্থ হলে তাকে যেনো কারাগারে ফেরার জন্য ছাড়পত্র দেয়া হয়।

হাসপাতালের ডাক্তার যদি ছাড়পত্র না দেন কারা কর্তৃপক্ষের কিছুই করার থাকে না। কারাগারে ডাক্তার সঙ্কট দূর হলে ভিআইপি বন্দিদের কারাগারের বাইরে চিকিৎসা নেয়ার প্রবণতা বন্ধ হয়ে যেতো। দুর্নীতির অভিযোগও উঠতো না।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Facebook Comments

সাম্প্রতিক খবর