শিরোনাম

ডোপ টেস্ট আতঙ্কে পুলিশ

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৯, ২০২০ ১১:০৩:৩৮ পূর্বাহ্ণ
ডোপ টেস্ট আতঙ্কে পুলিশ
ডোপ টেস্ট আতঙ্কে পুলিশ

সারাদেশে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে যারা মাদকাসক্ত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে শুরু হয়েছে চ‚ড়ান্ত অ্যাকশন। পুলিশ সদর দফতরের নির্দেশে ডোপ টেস্টের ফলাফলের ভিত্তিতে তাদের শনাক্ত করে চাকরিবিধি মেনে বাহিনী থেকে বরখাস্ত করে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে।

পর্যায়ক্রমে পুলিশের সকল ইউনিটে ও সকল রেঞ্জে এ পরীক্ষা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থতিতে মাদকাসক্ত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ডোপ টেস্ট আতঙ্ক। চাকরি রক্ষা করতে দীর্ঘদিন মাদক গ্রহণে অভ্যস্ত পুলিশ সদস্যরা গোপনে চিকিৎসকের কাছে দৌড়াচ্ছেন।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারসহ বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানের কারণে দিশাহারা হয়ে পড়ছেন মাঠ পর্যায়ে মাদকাসক্ত পুলিশ সদস্যরা। কারণ ডোপ টেস্টে ধরা পড়লে ও প্রমাণিত হলেই চাকরিচ্যুত- কোনো ছাড় নেই বলে জানিয়েছেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

ডিএমপি সূত্র জানায়, গত দুই মাসে মাদক সংশ্লিষ্টতার জন্য ডোপ টেস্টের মাধ্যমে ঢাকা মহানগর পুলিশে কর্মরত বিভিন্ন পদমর্যাদার ৭২ জন পুলিশ সদস্যকে শনাক্ত করা হয়েছে। শনাক্ত হওয়া সদস্যরা প্রায় নিয়মিত মাদকসেবন করতেন। কেউ কেউ কারবারিতেও জড়িত ছিলেন। এদের মধ্যে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হওয়ায় ঢাকায় কর্মরত ৯ পুলিশ সদস্যকে সম্প্রতি চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

চাকরিবিধি অনুযায়ী তদন্ত শেষে তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। মাদক সংশ্লিষ্টতার কারণে আরো অন্তত ৬২ জনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এদের মধ্যে ৮ জন পুলিশ সদস্যকে চাকরিচ্যুত করতে সাময়িক আদেশ জারি করা হয়। সূত্র জানায়, ডিএমপিতে মাদক সংশ্লিষ্টতা শনাক্ত হওয়া পুলিশ সদস্যের মধ্যে এসআই ৭ জন, সার্জেন্ট একজন, এএসআই ৫ জন, নায়েক ৫ জন ও কনস্টেবল ৫২ জন।

পুলিশের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, মাদকাসক্ত পুলিশ সদস্যদের বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়া হবে না- এমন নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বাহিনীর শীর্ষ পর্যায় থেকে। এরপর গত দুই মাস ধরে ঢাকা, সিলেট, বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশে শুরু হয়েছে ডোপ টেস্ট। সন্দেহজনক পুলিশ সদস্যদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে চলছে গোয়েন্দা কার্যক্রম। পর্যায়ক্রমে পুলিশের সব ইউনিটে ও বিভাগে ছড়িয়ে দেয়া হবে।

একই সূত্রমতে, ডোপ টেস্টের পর যথাযথ ব্যবস্থায় যেতে যেন প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা হয় ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যসহ অন্যদের মনোবল যেন না ভাঙে সেই বিষয়েও পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

ডিসি পর্যায়ের দুজন কর্মকর্তা জানান, প্রথমে বিভিন্ন দফায় যারা পুলিশ সদস্য হয়েও ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল বা অন্যান্য মাদক সেবনে যুক্ত ছিল তাদের সেই পথ পরিহার করতে বলা হয়। নচেৎ কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার আভাসও দেয়া হয়েছিল। বেশ কয়েক দফায় এমন বার্তা দেয়ার পর মাদকাসক্ত সদস্যদের চিহ্নিত করতে ডোপ টেস্টের উদ্যোগ নেয় পুলিশ।

জানা গেছে, মাদকাসক্ত সদস্যদের শনাক্ত করতে ডিএমপি বিশেষ টিম গঠন করেছে। প্রতিটি থানা, বিভিন্ন ইউনিট ও পুলিশ লাইন্সে এই ইউনিটের সদস্যরা কাজ করছে। কাউকে মাদকাসক্ত সন্দেহ হলে তার ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়। এরপর তাকে ডোপ টেস্টের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়।

ডিএমপি সূত্র জানায়, একটি স্পেশাল উইং দিয়ে ঝিমুনি ধরে থাকা, দায়িত্ব পালনে অনীহা দেখানোসহ অন্যান্য লক্ষণ থাকা পুলিশ সদস্যদের নজরদারি করা হচ্ছে। পরে তাদের মধ্যে যাদেরকে মাদকাসক্ত বলে সন্দেহ হয় তাদের ডোপ টেস্ট করানো হচ্ছে। কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করেই এই কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ঢাকায় গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও সিটি স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) এটি নিয়ে কাজ করছে। পাশাপাশি ডিএমপি সদর দফতরের ইন্টেলিজেন্স অ্যানালাইসিস ডিভিশন (আইএডি) সন্দেহভাজনদের তালিকা ক্রস চেক করে পুলিশ কমিশনারের কাছে তা হস্তান্তর করা হচ্ছে।

তথ্যমতে, ডোপ টেস্টের কার্যক্রম কেবল ঢাকা মহানগর পুলিশেই (ডিএমপি) থেমে নেই। এটি দেশের কয়েকটি এলাকায় সন্দেহভাজন পুলিশ সদস্যদের ওপর প্রয়োগ করা হচ্ছে। উচ্চপর্যায় থেকে নেয়া পুলিশের এই কার্যক্রমকে অনেকেই স্বাগত জানাচ্ছেন। মাদকের বিরুদ্ধে নিজের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) নতুন কমিশনার নিশারুল আরিফ। সম্প্রতি দায়িত্ব গ্রহণ করেই তিনি এসএমপির সব ইউনিটে পৌঁছে দিয়েছেন মাদকের বিরুদ্ধে তার জিহাদ ঘোষণার বার্তা।

জানা গেছে, সিলেট মহানগর পুলিশের আওতাধীন ছয় থানায় কর্মরত পুলিশ সদস্যদের ওপর কড়া নজরদারিও শুরু হয়েছে। কোনো পুলিশ সদস্যের মাদক গ্রহণের কোনো আলামত পাওয়া গেলে তাকে ‘ডোপ টেস্ট’-এর মুখোমুখি হতে হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, নতুন কমিশনারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ও কঠোর হুঁশিয়ারিতে এসএমপির বিরুদ্ধে তোলপাড় শুরু হয়েছে। যেসব পুলিশ সদস্য মাদকাসক্ত, তাদের মধ্যে ডোপ টেস্ট আতঙ্ক বিরাজ করছে।

অন্যদিকে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ (বিএমপি) কমিশনার শাহাবুদ্দিন খান বলেন, আমাদের এখানেও ডোপ টেস্টের প্রক্রিয়া চলমান আছে। টেস্টে যাদের পজিটিভ আসছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয়া হচ্ছে না। বিএমপিতে কর্মরত মাদকে সন্দেহভাজন পুলিশ সদস্যদের নজরদারির মধ্যে রাখা হচ্ছে।

ডোপ টেস্ট কার্যক্রম বিষয়ে পুলিশ সদর দফতরের মিডিয়া শাখার এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) মো. সোহেল রানা বলেন, বর্তমান আইজিপি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মাদক বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করছেন। আইজিপি বিশেষ করে ৫টি লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সেগুলো হলো- জিরো ড্রাগ, জিরো করাপশন, জিরো টর্চার, বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেয়া, পুলিশ কল্যাণ ও শৃঙ্খলা। এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, মাদক নির্মূল করতে গিয়ে পুলিশের একেকটি ইউনিট একেক রকমের ব্যবস্থা নিচ্ছে। কেউ ডোপ টেস্ট করছেন, কেউবা অন্য ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা চাই মাদকচক্র থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসুক পুলিশ। পুলিশের যেসব সদস্য মাদকের সঙ্গে যুক্ত থাকবে তাদের বিন্দুমাত্র ছাড় নয়। ডিএমপিতে এরই মধ্যে ৯ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। আরো কয়েকজনের বিষয় প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ডোপ টেস্টের মাধ্যমে মাদকাসক্ত পুলিশ সদস্য শনাক্ত করার প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণের মধ্য দিয়ে অভিযোগ প্রমাণ করে মাদকাসক্ত পুলিশ সদস্যদের চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করা হবে।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Facebook Comments

সাম্প্রতিক খবর