শিরোনাম

নতুন ডেঙ্গু রোগী ঢাকার বাইরে বেশি, নজর কম

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : মঙ্গলবার, আগস্ট ২৭, ২০১৯ ৬:১২:১৯ পূর্বাহ্ণ

নতুন ডেঙ্গু রোগী কমে এলেও ঢাকার বাইরে এখনো তা বেশি। দুই সপ্তাহ ধরে প্রতিদিনই ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরের হাসপাতালে বেশি রোগী ভর্তি হচ্ছে। এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপের শুরুতে আক্রান্ত রোগীদের অধিকাংশই ছিল ঢাকার। পরে বাইরে স্থানীয়ভাবে আক্রান্ত হওয়ার হার বাড়তে থাকে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) জরিপের তথ্য বলছে, ঢাকার বাইরে প্রায় ৩৯ শতাংশ রোগী স্থানীয়ভাবেই আক্রান্ত হয়েছে।

ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত বেশি, এমন ১৪টি জেলায় খোঁজ নিয়েছেন প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা। এতে দেখা যায়, সব সিটি করপোরেশন বা পৌর এলাকায় মশকনিধন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়ার পরও শহর এলাকার বাইরের জায়গাগুলোতে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। মশকনিধনে ঢাকার তুলনায় বাইরে মনোযোগ কম।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঢাকার বাইরে প্রায় ২০ হাজার চিকিৎসককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু ভাইরাস পরীক্ষার কিট কিনতে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

রোগের প্রকোপ জানতে ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম ও খুলনায় নিয়মিত নজরদারির ব্যবস্থা আছে আইইডিসিআরের। আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সম্প্রতি বরিশাল বিভাগের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নজরদারির আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞানীরা রোগের তথ্যের পাশাপাশি বরিশাল থেকে মশার লার্ভা ঢাকায় এনেছেন। বরিশাল নিয়ে পর্যালোচনার পর নতুন করে আরও কয়েকটি জেলা এ নজরদারির আওতায় আনা হতে পারে। ময়মনসিংহের নাম শিগগিরই এ তালিকায় যুক্ত হতে পারে বলে জানিয়েছেন আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা।

২০০০ সালে ঢাকায় ব্যাপকভাবে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ে। তারপর থেকে গত বছর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ মূলত ঢাকা শহরে সীমাবদ্ধ ছিল। খুলনা ও চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর সামান্য কিছু অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু এবার ৬৪ জেলায় ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে। স্থানীয়ভাবে ডেঙ্গুর সংক্রমণ হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞদের দুশ্চিন্তা বেড়েছে। স্থানীয়ভাবে সংক্রমণের অর্থ, দেশের বহু জায়গায় এডিস মশা আছে। আগামী বছরগুলোতে এসব এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে।

এডিসের দুটি প্রজাতি আছে। একটি হলো এডিস ইজিপটাই, অপরটি এডিস অ্যালবোপিকটাস। ডেঙ্গু সংক্রমণ ঘটে মূলত এডিস ইজিপটাইয়ের মাধ্যমে। কিন্তু এখন এডিস অ্যালবোপিকটাসের একটি অংশও ডেঙ্গু ভাইরাসবাহী হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন মশক বিশেষজ্ঞ কবিরুল বাশার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন সময়ে ২২টি জেলায় জরিপ চালানো হয়েছে, সব কটিতেই এডিস পাওয়া গিয়েছিল। ঢাকার বাইরে বিস্তর গবেষণা দরকার, আর তা না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল পর্যন্ত ১৭৫ জনের মৃত্যুর খবর পেয়েছে প্রথম আলো। সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, পরিবারের সদস্য, সিভিল সার্জন ও সরকারি হিসাব সমন্বয় করে মৃত্যুর এই তথ্য পাওয়া গেছে। এতে দেখা যায়, শুরুতে ঢাকায় হলেও এখন ঢাকার বাইরে মারা যাচ্ছে বেশি। এ পর্যন্ত ঢাকার বাইরে মারা গেছে ৫২ জন, যাদের মধ্যে এ মাসেই মারা গেছে ৪৮ জন। এদের কারও কারও মৃত্যু হয়েছে ঢাকায় আনার পথে। আর এ মাসে ঢাকায় মারা গেছে ৪৫ জন। আগস্টের আগে এ বছর ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মোট মৃত্যু হয়েছে ৮২ জনের, যাদের মধ্যে ঢাকার বাইরে ছিল মাত্র ৪ জন।

এবার ৬৪ জেলায় ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে
ঢাকার বাইরে প্রায় ৩৯% রোগী স্থানীয়ভাবে আক্রান্ত
শহর এলাকার বাইরে মশকনিধনে তেমন উদ্যোগ নেই
ঢাকার বাইরে প্রায় ২০ হাজার চিকিৎসককে প্রশিক্ষণ

ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক প্রধান আবিদ হোসেন মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, মশকনিধনে যত ধরনের উদ্যোগের কথা ঢাকায় শোনা যাচ্ছে, সারা দেশেই তা প্রয়োগ করতে হবে। ঢাকার চিকিৎসকেরা অধিক রোগীর চিকিৎসা দিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। এই অভিজ্ঞতার আলোকে ঢাকার বাইরের চিকিৎসকদের দক্ষ করে তুলতে হবে।

এখন পর্যন্ত ১৭৩ জনের মৃত্যুর খবর পেয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, যাদের মধ্যে ঢাকার বাইরে ৩২ জনের মৃত্যুর তথ্য আছে তাদের কাছে। সব মিলিয়ে ৮৮টি মৃত্যু পর্যালোচনা করে ডেঙ্গুতে ৫২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গঠিত ডেঙ্গুতে মৃত্যু পর্যালোচনা কমিটি নিয়মিত যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করছে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত ২৫ থেকে ৩১ জুলাই সারা দেশে সপ্তাহব্যাপী বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি ও মশকনিধন অভিযান চালাতে জেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়েছিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এরপরও ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু রোগী বাড়তে থাকায় ওই অভিযান অব্যাহত রাখতে নির্দেশনা পাঠানো হয়। জেলা প্রশাসনকে বাড়তি বরাদ্দও দেওয়া হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

অবশ্য ১ থেকে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত করা আইইডিসিআরের জরিপে দেখা গেছে, ডেঙ্গু রোগীদের ৩৯ শতাংশ ঢাকায় না গিয়েই আক্রান্ত হয়েছে। ৬১ শতাংশ আক্রান্ত হওয়ার ঠিক আগের দুই সপ্তাহের মধ্যে ঢাকায় গিয়েছে। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় আক্রান্ত ১ হাজার ৯৮ জন রোগীর ওপর এই জরিপ চালানো হয়েছে।

বরিশাল, রাজশাহী, খুলনা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, যশোর, কুমিল্লা, সিলেট, চাঁদপুর, বগুড়া, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, রংপুর ও মাদারীপুর জেলার প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করে জানিয়েছেন, শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে সপ্তাহে এক দিন করে মশা মারার ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন এলাকায় মশার বিস্তার ঘটার মতো পরিবেশ-পরিস্থিতি দেখা গেছে। তবে স্থানীয়দের সচেতন করতে জেলা প্রশাসন ও সিভিল সার্জনের পক্ষ থেকে প্রচারপত্র বিলি, শোভাযাত্রা, সেমিনার করা হয়েছে।

গতকাল খুলনা শহরের বাস্তুহারা এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে আছে। বাস্তুহারা খালে ময়লার স্তূপ। ২০ নম্বর ওয়ার্ডের শেখপাড়া পুরাতন মসজিদ গলির বাসিন্দা ফাতেমা বেগম বলেন, ঈদের আগে একবার তাঁদের এলাকায় ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ দেওয়া হয়েছিল।

খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. আবদুল আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, জনবল কিছুটা কম আছে। তবে আবহাওয়া বুঝে লার্ভিসাইট স্প্রে ও ফগারিংয়ের মাধ্যমে অ্যাডাল্টিসাইট দেওয়া হচ্ছে।

রংপুর শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত শ্যামাসুন্দরী খালে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ জমেছে। এতে মশার বিস্তার ঘটছে। রংপুরের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান বলেন, বাসাবাড়ির বর্জ্য খালে ফেলছে মানুষ। নগরবাসীকে সচেতন হওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।

বগুড়ার জলেশ্বরীতলার নালা–নর্দমা যেন মশা বিস্তারের চারণভূমি। মাদারীপুরের বিভিন্ন হাসপাতাল ও বিভিন্ন অফিস প্রাঙ্গণে পানি জমে থাকে। ফরিদপুর শহরের বিভিন্ন জায়গায়ও পানি জমে থাকায় মশার বংশবিস্তারের সুযোগ থেকে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাহবুব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সব জেলা, উপজেলা, ইউনিয়নে চলমান কার্যক্রম নিয়মিত তদারক করা হচ্ছে। কোথাও কোনো গাফিলতি পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য বলছে, ঈদের পরদিন থেকে ঢাকার বাইরে রোগী ভর্তি বেড়েছে। ১৩ আগস্ট ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় ভর্তি হয়েছে ৬০০ জন আর ঢাকার বাইরে ভর্তি হয় ৬০১ জন। এরপর প্রতিদিনই এ ব্যবধান বেড়েছে। সর্বশেষ গত রোববার ঢাকায় ভর্তি হয়েছে ৫৭৭ জন আর ঢাকার বাইরে ৬৭৪ জন। গত দুই সপ্তাহে সারা দেশে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২১ হাজার ৪৮৮ জন। এদের মধ্যে ঢাকায় ভর্তি হয়েছে ৯ হাজার ৭১০ জন আর ঢাকার বাইরে ভর্তি হয়েছে ১১ হাজার ৭৭৮ জন।

Spread the love
Facebook Comments

সাম্প্রতিক খবর

Contact Us