শিরোনাম

ফি আদায়ের পরও বাসা বা‌ড়ির বর্জ‌্য বু‌ড়িগঙ্গায়

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : রবিবার, নভেম্বর ১৪, ২০২১ ৭:০৯:১৬ অপরাহ্ণ
ফি আদায়ের পরও বাসা বা‌ড়ির বর্জ‌্য বু‌ড়িগঙ্গায়
ফি আদায়ের পরও বাসা বা‌ড়ির বর্জ‌্য বু‌ড়িগঙ্গায়
জবি প্রতিনিধি
রাজধানীর দ‌ক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রতি‌টি ওয়ার্ড এলাকায় গৃহস্থ‌লি বর্জ‌্য প্রতি‌দিন তু‌লে এইচ‌টিএসে (সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন/ময়লা রাখার বা প্রক্রিয়া করার জায়গা) পৌ‌ঁছে দেয়ার জন‌্য প্রতি‌টি বা‌ড়ি ও ফ্ল্যাট থে‌কে এক‌শত থে‌কে পাঁচশত টাকা পর্যন্ত আদায় কর‌া হ‌চ্ছে। ‌ত‌বে নাগ‌রিক‌দের অ‌ভি‌যোগ, টাকা দি‌য়েও তারা সেবা পা‌চ্ছে না। এসব বাসা বাড়ির বর্জ্য আবার ফেলা হচ্ছে বুড়িগঙ্গায়, যা নদীতে ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ছে।
স‌রেজ‌মি‌নে জানা গে‌ছে, রাজধানীর লালবাগ বেড়ী বাঁধ, কামরাঙ্গীর চর, শ‌্যামবাজার, সদরঘাট, কেরানীগ‌ঞ্জের আগানগর, তৈল ঘাট ও পার গেন্ডা‌রিয়া এলাকা ও আশপা‌শের এলাকার বাসাবা‌ড়ি থে‌কে সংগৃ‌হিত বর্জ‌্য নদী‌তে ফেলা হচ্ছে। বাসাবা‌ড়ি থে‌কে ভ‌্যা‌নের মাধ‌্যমে সংগ্রহ করা বর্জ‌্য নদীর পা‌ড়ে এ‌নে স্তুপ করা হ‌চ্ছে। প‌রে রা‌ত ও দি‌নের সু‌বিধা জনক সম‌য়ে ওইসব বর্জ‌্য শ্রমিকরা কোদাল দি‌য়ে টে‌নে নদীর পা‌নি‌তে ভা‌সি‌য়ে দি‌চ্ছে। এলাকার বা‌সিন্দা ও চলাচলরত মানুষ ব‌র্জ্যের উৎকট দূর্গ‌ন্ধে অ‌তিষ্ঠ হ‌য়ে উ‌ঠে‌ছে। এছাড়া প্রতি‌দিন সদরঘা‌টে চলাচলকারী শতা‌ধিক ল‌ঞ্চের বর্জ‌্যও সরাস‌রি নদী‌তে ফেলা হ‌চ্ছে। শ‌্যামবাজার ও বাদামতলীর আড়‌তের বর্জ‌্য ছাড়ায় চর কালীগ‌ঞ্জের ডক ইয়ার্ডগু‌লো‌তে জাহাজ মেরামতকা‌লে তৈল, রং ও লোহার জংসহ বি‌ভিন্ন রাসায়‌নিক বর্জ‌্য নদী‌তে ফেলা হ‌চ্ছে। ওইসব এলাকায় ময়লা নি‌ক্ষেপকারীরা রাজ‌নৈ‌তিক মদদপুষ্ঠ হওয়ায় সাধারণ মানুষ এর প্রতিবাদ কর‌তে পার‌ছেনা ব‌লে জা‌নি‌য়ে‌ছেন এলাকার একা‌ধিক ব‌্যা‌ক্তি ও জনপ্রতি‌নি‌ধিরা। শুধু গৃহস্থ‌লি বর্জ‌্যই নয়, রাজধানীর থে‌কে ওয়াসা ও সি‌টি কর‌পো‌রেশ‌নের আড়াই শত ড্রেনের মাধ‌্যমে বু‌ড়িগঙ্গায় প্রতি‌দিন অন্তত ৫০ হাজার টন বর্জ‌্য নি‌ক্ষিপ্ত হ‌চ্ছে ব‌লে ম‌নে ক‌রেন বি‌শেষজ্ঞরা।
ইসলামবাগ এলাকার ব‌্যবসায়ী গোলাম মীর্জা নামে এক ব্যক্তি জানান, আ‌গে সপ্তা‌হে ছয় দিন ময়লা (গৃহস্থ‌লি বর্জ‌্য) নি‌লেও এখন ৪দিন নি‌চ্ছেন। প্রতি‌টি বা‌ড়ি‌র নী‌ছে ড্রামে ময়লা ফেলার জন‌্য বলা হ‌য়ে‌ছে। বা‌সিন্দারা উপায়ান্তর ন‌া পে‌য়ে প্রত্যেক বা‌ড়ি‌তে ড্রামে ময়লা জমা কর‌তে বাধ‌্য হ‌চ্ছে। এ‌তে সমগ্র এলাকা ডাষ্ট‌বিনে প‌রিণত হ‌য়ে‌ছে। দুই তিন দিন পুরা‌নো ময়লার দূর্গ‌ন্ধে অ‌তিষ্ঠ হ‌য়ে উঠ‌ছে বা‌সিন্দারা। এভা‌বে পুরান ঢাকায় নদী পা‌ড়ের ওয়ার্ডগু‌লোতে সৃষ্ট মানব বর্জ‌্য বু‌ড়িগঙ্গায় নি‌ক্ষিপ্ত হ‌চ্ছে ব‌লে অ‌ভিযোগ র‌য়ে‌ছে। বর্জ্যের দূর্গন্ধে বা‌সিন্দা‌ ও নদী‌তে পারাপার হওয়া মানুষের না‌ভিশ্বাস উ‌ঠে‌ছে। এছাড়া নদী লা‌গোয়া কাঁচা মা‌লের আড়ৎ ও নৌযান মেরাম‌তের বর্জ‌্যও ফেলা হ‌চ্ছে নদী‌তে। নদী‌ দূষণ রো‌ধে উচ্চ আদাল‌তের নি‌র্দেশনাও উ‌পে‌ক্ষিত হ‌চ্ছে। বু‌ড়িগঙ্গার তীর ঘু‌রে এমন চিত্র দেখা গে‌ছে।
কাউসার আলম নামের একজন স্থানীয় বা‌সিন্দা ব‌লেন, ময়লা বাণিজ্য ক‌রে ক্ষমতাসীন দ‌লের অ‌নেক নেত‌া রাতারা‌তি নি‌জে‌দের ভাগ‌্য বদল ক‌রে‌ছেন। তাদের নি‌য়ো‌জিত লোকজন দিয়ে প্রতি‌টি বাড়ি ও ফ্ল‌্যাট থে‌কে প্রতি মা‌সে ১শত থে‌কে ৫শত টাকা পর্যন্ত আদায় কর‌ছেন। আর নদী‌তে বর্জ‌্য নি‌ক্ষেপের নি‌র্দেশ দাতারা সাধারণত ক্ষমতাসীন রাজ‌নৈ‌তিক দ‌লের নেতা হওয়ায় ভ‌য়ে কেউ প্রতিবাদ ক‌রেন না।
আগানগর বটতলা ঘা‌টে বর্জ‌্য ফেলা প্রস‌ঙ্গে একা‌ধিক মা‌ঝি ব‌লেন, ময়লার ইজারাদা‌রেরা অনেক ক্ষমতাশালী। আগানগর ইউনিয়নের সমস্ত বাসাবা‌ড়ির ময়লা রা‌তের আঁধা‌রে বুড়িগঙ্গায় ফেলা হ‌লেও কেউ কোনো ”টুঁ” শব্দ‌টি করেনা। অত্র ইউনিয়নের চেয়ারম্যানও কথা বলতে পারছেন না ব‌লে জানান তারা।
জাতীয় নদী রক্ষা ক‌মিশ‌নের চেয়ারম‌্যান এ এস এম আলী কবীর ব‌লেন, জাতীয় নদী রক্ষা ক‌মিশনের ল‌জি‌স্ট্রিক সা‌পোর্ট না থাকায় অন‌্যান‌্য সংস্থার উপর নির্ভর কর‌তে হয়। তারপরও দখল ও দূষণকারী‌দের বিরু‌দ্ধে ব‌্যবস্থা নেয়া হ‌চ্ছে ব‌লে জানান তি‌নি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৩৭নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আব্দুর রহমান মিয়াজী বলেন, জনগণ সচেতন না হলে নদীতে বর্জ্য নিক্ষেপ সম্ভব। সিটি কর্পোরেশন থেকে প্রতিটি ওয়ার্ডে ময়লা ফেলার জন্য টিকাদার নিযুক্ত করা আছে, কিন্তু ধার্যকৃত ৩০ টাকা বাঁচাতে তারা নদীতে ময়লা ফেলছেন। আমরা বার বার বিআইডব্লিউটিএ ও লঞ্চ মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছি এবং ময়লাগুলো একটা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে বলেছি টিকাদারের সাথে আপাল করে। কিন্তু তারা কথা আমলে নেয়নি, নিয়মিতই ময়লা ফেলে যাচ্ছে। বিশেষ করে সদরঘাট এলাকার মুন কমপ্লেক্স অনবরত এই কাজ করে যাচ্ছে।
ডিএসসিসি ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনারের মোহাম্মদ হোসেনের সাথে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তিনি কল রিসিভ করেন নি।
ডিএসসিসি ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার নূরে আলম বলেন, কামরাঙ্গীচরে কোন সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন না থাকায় বাসা বাড়ির ময়লা নদীর পাড়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা হয়। সেখান থেকে গাড়ি করে বর্জ্য ডাম্পিং এ পৌঁছানো হয়। ঠিকাদার কর্তৃক অতিরিক্ত টাকা আদায়ের কথা অস্বীকার করেন তিনি।
২০১৯ সা‌লের ৩ ফেব্রুয়ারী নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করেছে উচ্চ আদালত। ফলে তখন থেকে নদী দখল, ভরাট, নদী দূষণ ফৌজাদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে ব‌লে আদালত ঘোষণা দেয়৷ ওই রা‌য়ে দেশের সব নদ-নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা ক‌রে সরকারী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ১৭ দফা নির্দেশনা দেয় আদালত। ওই নি‌র্দেশনা অনুযায়ী সরকার নদী দখল ও দূষণকারীদের তালিকা করে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশও ক‌রে‌ছে৷ এছাড়া তা‌দের নির্বাচনে অযোগ্য ও ব‌্যাংক ঋনে নি‌ষেধাজ্ঞা দেয়া, দায়ীদের অর্থে নদী দখল ও দূষণমুক্ত করার নি‌র্দেশ দেয়া হয়। য‌দিও এসব নি‌র্দেশনাগু‌লো এখন পর্যন্ত বাস্ততে প্রয়োগ হ‌তে দেখা যায়‌নি।
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Facebook Comments

সাম্প্রতিক খবর

Contact Us