শিরোনাম

বেসরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ইচ্ছেমতো ফি নয়

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৯, ২০২০ ১:০০:৩৭ অপরাহ্ণ
বেসরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ইচ্ছেমতো ফি নয়
বেসরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ইচ্ছেমতো ফি নয়

রোগীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো ফি আদায়ের দিন শেষ হতে যাচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে তিন স্তরে ভাগ করে বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সেবার ফি নির্ধারণ করে দেবে সরকার। শিগগির এ সংক্রান্ত নীতিমালা জারি করা হবে। শুধু তাই নয়, অফিস সময়ে কোনো সরকারি চিকিৎসক বেসরকারি হাসপাতালে সেবা দিতে পারবেন না।

পাশাপাশি বাধ্যতামূলক হচ্ছে স্থায়ীভাবে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের ফটোকপি ও বিভিন্ন সেবার মূল্য প্রদর্শন করা। আর এসব নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ হচ্ছে কি না, তা দেখাভালে গঠিত হবে ৩ সদস্যের পাঁচটি পরিদর্শন দল। বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের নানা অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা দূর করতেই মূলত এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।

এগুলোর বাস্তবায়ন হলে স্বাস্থ্যসেবার নামে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিধিবহির্ভূতভাবে যে বাণিজ্য করে আসছে, তা রোধ হবে। এ ছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিশ্চিত হবে সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা। এতে জনগণ প্রতারিত হবে না, সঠিক মূল্যে চিকিৎসা পাবে-এমনটি মনে করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক বুধবার বলেছেন, বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত চিকিৎসা ফি, টেস্ট ফিসহ অন্যান্য ফি সরকারিভাবে নির্ধারণ করে দেয়া হবে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে ক্যাটাগরিভিত্তিক নির্ধারণ করা হবে।

এ জন্য মন্ত্রণালয় থেকে কিছু দিনের মধ্যেই গঠন করা হবে একটি শক্তিশালী কমিটি। এ কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী নেয়া হবে পরবর্তী পদক্ষেপ। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আগামীতে প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেসব চার্জ হবে এবং তারা যে সেবা দেবে, সেগুলোর মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া হবে। হাসপাতাল মালিকদের সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে করা হবে সবকিছু।

তিন আরও বলেন, যে চার্জ নির্ধারণ করে দেয়া হবে, সেগুলো সংশ্লিষ্ট ক্লিনিক, হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে প্রদর্শন করতে হবে। সেখানে প্রতিটি সেবার মূল্য সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। এগুলো একটা বোর্ডে টানানো থাকবে, যা সরকারি হাসপাতালে আছে।

বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ক্যাটাগরি নির্ধারণ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন হাসপাতালের মান আলাদা, কোনো বড় হাসপাতাল বা ক্লিনিকে হয়তো অনেক অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। তাই ক্যাটাগরি নির্ধারণ করে দেয়া হবে।

এমন উদ্যোগে হাসপাতালগুলোও ‘রাজি আছে’। জাহিদ মালেক বলেন, জনগণ যাতে প্রতারিত না হয়, জনগণ যাতে সঠিক মূল্যে চিকিৎসা পায়, পরীক্ষা-নিরীক্ষা সঠিক মূল্যে করতে পারে-সেটি নিশ্চিতে আমরা কমিটি গঠন করে দেব।

কমিটি আস্তে আস্তে তাদের নিয়ে এ কাজগুলো করে সুন্দর একটি সমাধান দেবে। এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২৯ অক্টোবর সচিবালয়ের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জনস্বাস্থ্য-১ অনু বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এবং টাস্কফোর্স কমিটির আহ্বায়ক মোস্তফা কামালের সভাপতিত্বে কমিটির একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় টাস্কফোর্স কমিটির অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ৪টি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এগুলো হল : ১. অফিস সময়ে সরকারি হাসপাতালের কোনো চিকিৎসক বেসরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকতে পারবেন না। কোনো কারণে কর্মরত অবস্থায় থাকলে টাস্কফোর্স ও সংশ্লিষ্টদের অবগত করতে হবে।

২. হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ল্যাব, ক্লিনিকগুলোয় লাইসেন্স নিবন্ধন নম্বর স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। ৩. টাস্কফোর্স কর্তৃক সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক পরিদর্শন/অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। ৪. এ ছাড়া ১৬ নভেম্বরের পর অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

২৬ জুলাই কোভিড-১৯ বিষয়ক উল্লিখিত টাস্কফোর্স গঠন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এরপর ৮ আগস্ট টাস্কফোর্সের দ্বিতীয় সভায় বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স নবায়ন সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পাশাপাশি সেই সভা শেষে টাস্কফোর্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২৩ আগস্টের মধ্যে বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স নবায়ন করতে হবে। এ সময়ের মধ্যে যারা নবায়নে ব্যর্থ হবে তাদের হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হবে। এ ধরনের সিদ্ধান্তের পর প্রায় ৩ মাস অতিবাহিত হতে চলেছে। এমন সময় আবারও নড়েচড়ে বসেছে টাস্কফোর্স।

আরও জানা গেছে, এখন থেকে কোনো বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলেই সেখানে অভিযান পরিচালনা করা হবে। এ ছাড়া রাজধানী ও এর আশপাশের বেসরকারি সেবা-প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত মনিটরিংয়ে রাখতে ৩ সদস্যবিশিষ্ট ৫টি কমিটি করা হবে। প্রতিটি কমিটির নিয়মিত নির্দিষ্ট এলাকা পরিদর্শনের দায়িত্ব থাকবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য সচিব ডা. শিব্বির আহমেদ ওসমানী  বলেন, সরকার দেশের স্বাস্থ্যসেবায় শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। শিগগির এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন হবে।

এসব বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান  বলেন, এগুলো ভালো উদ্যোগ। তবে প্রথমেই এগুলো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ঠিক করতে হবে। তাছাড়া এসব বাস্তবায়নের জন্য আইনগত ও নৈতিক ভিত্তি থাকতে হবে। যাতে গৃহীত এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে বাধার মুখে না পড়তে হয়। তিনি বলেন, মূল্যতালিকা বা লাইসেন্স প্রদর্শনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যতালিকা অনুযায়ী সেবা বাস্তবায়ন এবং প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন নিয়মিত নবায়ন নিশ্চিত করা।

অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮২ সাল থেকে এ পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে নিবন্ধন নিয়ে সারা দেশে ১৫ হাজারের কিছু বেশি প্রতিষ্ঠান হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক, ব্লাড ব্যাংক পরিচালনা করে আসছে। বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদফতরের কাছে তালিকা আছে ১৩ হাজার ৪২৬টির। বাকি দেড় হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানের কোনো হদিস নেই। অথচ প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অধিদফতর এখন এ সাড়ে ১৩ হাজার প্রতিষ্ঠান ধরেই হিসাব কষছে। চলতি বছর সেই তালিকা থেকে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে ৬ হাজার ১৬টি। ত্রুটিপূর্ণ আবেদনসহ নানা কারণে বাকি ৭ হাজার ৪১০টির লাইসেন্স নবায়ন হয়নি। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন ছাড়া অবৈধভাবে চলছে। অথচ যাদের লাইসেন্স আছে তাদের প্রতিবছর নবায়ন করার কথা। এ ব্যাপারে বাধ্যবাধকতাও আছে। কিন্তু বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান তা মানছে না। নিবন্ধন হালনাগাদ করতে (লাইসেন্স নবায়ন) চাপ দিলেও বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক তোয়াক্কা করে না। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করে নবায়ন ছাড়াই রমরমা বাণিজ্য চালাচ্ছে কয়েক হাজার হাসপাতাল ও ক্লিনিক।

এমন পরিস্থিতিতে দেশের বেসরকারি হাসপাতাল- ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোকে শৃঙ্খলায় আনতে চলতি মাসের ৮ তারিখ দেশের সব সিভিল সার্জনকে নির্দেশ দেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক। ওই দিন তিনি ভিডিও কনফারেন্সে সব বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) এবং সিভিল সার্জনদের পরের ৩ কার্যদিবসের মধ্যে নিজ নিজ জেলায় অনিবন্ধিত, অবৈধ ও নিয়মবহির্ভূতভাবে পরিচালিত সেবার মান খারাপ এমন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশ দেন। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নিয়ে প্রয়োজনে সিলগালা করে মহাপরিচালককে অবগত করতে নির্দেশ দেয়া হয়। ৯ নভেম্বর এ সংক্রান্ত আদেশ জারি হয়। তবে ৩ কর্মদিবস ইতোমধ্যে শেষ হলেও কোনো জেলা বা বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত তথ্য এখনও আসেনি।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলম  বলেন, লাইসেন্স নবায়নের বিষয়টি একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমি সব সিএসকে বলেছি জেলা থেকে তালিকা পাঠাতে। তারা রোববার পর্যন্ত সময় নিয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের জনবল স্বল্পতা রয়েছে। তালিকা ধরে নিয়মবহির্ভূত হাসপাতাল-ক্লিনিকে অভিযান চালিয়ে সেগুলো বন্ধ করা হবে। তবে একসঙ্গে সব জায়গায় হয়তো অভিযান চালানো যাবে না। আমি সিভিল সার্জনদের বলেছি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অনিবন্ধিত হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে।
এ প্রসঙ্গে প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মুবিন খান  বলেন, বেসরকারি সেবাপ্রতিষ্ঠানের মূল্য নির্ধারণের বিষয়ে আমরা সবাই একমত। দু-একটি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন নেই, তারা চিকিৎসার নামে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে। এর দায়ভার আমরা সবাই

নিতে পারি না। তিনি বলেন, সরকার যদি হাসপাতালগুলো ক্যাটাগরি করে ভারত বা থাইল্যান্ডের মতো সেবামূল্য নির্ধারণ করে দেয়, তাহলে আমাদের জন্য সুবিধা হবে এবং রোগীর জন্যও। কারণ, কোথায় কোন সেবা পাওয়া যাবে, তার জন্য কত মূল্য দিতে হবে-সেটি দেখে রোগী নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন-তিনি কোথায় সেবা নেবেন।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Facebook Comments

সাম্প্রতিক খবর