শিরোনাম

মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের রেজিস্ট্রার রিমান্ডে

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : বুধবার, নভেম্বর ১৮, ২০২০ ৮:৩৮:৪৬ পূর্বাহ্ণ
মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের রেজিস্ট্রার রিমান্ডে
মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের রেজিস্ট্রার রিমান্ডে

বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠানোর অভিযোগে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের রেজিস্ট্রার ডা. আবদুল্লাহ আল মামুনকে মঙ্গলবার দু’দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। এদিন সকালে শেরেবাংলা নগর সরকারি স্টাফ কোয়ার্টারের বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার পরামর্শেই সিনিয়র এএসপি আনিসুল করিমকে মাইন্ড এইডে নেয়া হয়েছিল।

আনিসুল করিম হত্যা মামলায় আদালতে দেয়া ৪ জনের স্বীকারোক্তিতে তার (মামুন) নাম উঠে আসে। মঙ্গলবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তেজগাঁও বিভাগের ডিসি হারুন অর রশিদ এ তথ্য জানান। পুলিশ জানিয়েছে, আনিসুল হত্যা মামলায় ডা. মামুনসহ এ পর্যন্ত ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হল। তাছাড়া শেরেবাংলা নগর ও মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে ২৫ দালালকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া শেরেবাংলা নগর ও মোহাম্মদপুর এলাকায় অবৈধ ক্লিনিক ও হাসপাতালের তালিকা করছে পুলিশ। এ ছাড়া মঙ্গলবার মাইন্ড এইডের আরও দুই কর্মচারী দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে ডিসি হারুন অর রশিদ বলেন, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল থেকে ডা. আবদুল্লাহ আল মামুন প্রায়ই মাইন্ড এইড হাসপাতালে রোগী পাঠাতেন। বিত্তশালী কোনো রোগী মানসিক সমস্যার চিকিৎসা নিতে গেলেই তাকে কৌশলে মাইন্ড এইডসহ অন্যান্য ক্লিনিকে পাঠিয়ে দিতেন রেজিস্ট্রার ডা. আবদুল্লাহ আল মামুন। বিনিময়ে তিনি ৩০ পার্সেন্ট কমিশন পেতেন।

ডিসি বলেন, গত ৯ নভেম্বর সকালে আনিসুল করিমের স্বজনরা তাকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটে নিয়ে যান। সেখানে একজন চিকিৎসক পান তারা। তিনি রোগীকে না দেখেই দুটি ইনজেকশন লিখে দেন। হাসপাতালের এক কর্মচারী নিজেই পুলিশ কর্মকর্তাকে ইনজেকশন পুশ করেন। পরে আনিসুলের স্বজনরা হাসপাতালটির রেজিস্ট্রার ডা. আবদুল্লাহ আল মামুনের কাছে যান। মামুন তাদের পরামর্শ দিয়ে বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালে এ ধরনের রোগীর খুব ভালো চিকিৎসা মেলে না। দ্রুত রোগীকে মাইন্ড এইডে ভর্তি করলে ভালো হবে। এর পরই ডা. মামুন মাইন্ড এইডের ম্যানেজার আরিফকে ফোন করে বলেন, একজন রোগী পাঠাচ্ছি। তার দ্রুত ভর্তির ব্যবস্থা করেন। ওই চিকিৎসকের কথায় আস্থা রেখে আনিসুল করিমকে নিয়ে স্বজনরা মাইন্ড এইডে যান। আনিসুলকে হত্যার পর আবার মাইন্ড এইড হাসপাতাল থেকে ডা. মামুনকে ফোন করা হয়। আনিসুল করিম মারা গেছেন জেনেও ডা. মামুন তাকে (আনিসুল) ওই হাসপাতাল থেকে বের করে অন্য হাসপাতালে পাঠানোর জন্য দৌড়ঝাঁপ চালান। নিজে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটে পাঠান। যেন কোনোভাবেই তার দায়িত্বে অবহেলা না বোঝা যায়।

সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে পাঠালে ডা. মামুন কী ধরনের সুবিধা পেতেন-এমন প্রশ্নের জবাবে ডিসি হারুন বলেন, একজন রোগীকে ওই হাসপাতলে পাঠালে দালাল ১০ পার্সেন্ট কমিশন পেয়ে থাকে। আর ডা. মামুন রোগী পাঠালে ৩০ পার্সেন্ট কমিশন পান। মূলত কমিশনের লোভে নিজেই রোগী ভাগাতে সাহায্য করেন।

ডিসি জানান, গ্রেফতার ব্যক্তিদের মধ্যে ৪ জন দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের বক্তব্যে মাইন্ড এইডের অপকর্মে ডা. মামুনের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে।

পরিচালক ডা. নিয়াজ মোর্শেদ অসুস্থ থাকায় তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আর বাকিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ডিসি হারুন বলেন, ডাক্তার মামুন মাইন্ড এইড হাসপাতাল ছাড়াও টাঙ্গাইলের একটি এবং ঢাকার আরেকটি বেসরকারি হাসপাতালে রোগী দেখেন। একজন সরকারি ডাক্তার কীভাবে অবৈধ ক্লিনিকে পার্টটাইম জব করবেন, রোগী এখান থেকে ভালো ট্রিটমেন্টের নামে অবৈধ ক্লিনিকে পাঠিয়ে দেন-এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন এ পুলিশ কর্মকর্তা।

ডিসি হারুন বলেন, ডা. মামুনকে জিজ্ঞাসা করলাম, হাসপাতালের কোনো বৈধ কাগজপত্রই নেই, আপনি কীভাবে এ হাসপাতালে বসে রোগী দেখেন। এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। কেন রোগীকে মাইন্ড এইডে পাঠালেন-এর কোনো জবাব দিতে পারেননি তিনি।

গত ৯ নভেম্বর সিনিয়র এএসপি আনিসুল করিম আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতালে মানসিক রোগের চিকিৎসা নিতে গিয়ে মারধরের শিকার হয়ে মারা যান। এরপর আনিসুলকে মারধরের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে আনিসুল করিমকে মারধর করে হত্যার সত্যতা পায়। এ ঘটনায় ১০ নভেম্বর আনিসুল করিমের বাবা ফাইজ্জুদ্দিন আহমেদ বাদী হয়ে মাইন্ড এইডের ১৫ জনকে আসামি করে আদাবর থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলার এজাহারভুক্ত ১২ আসামিকে পুলিশ গ্রেফতার করে। ডা. আবদুল্লাহ আল মামুনকেও এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তাকে নিয়ে মোট ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হল।

ডিসি হারুন বলেন, মামলার এজাহারে মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের রেজিস্ট্রার মামুনের নাম নেই। তবে সংশ্লিষ্টতার কারণে তাকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া মামলায় আরেকজন ডা. আবদুল্লাহ আল মামুনের নাম আছে। তিনিসহ পলাতক ৩ আসামিকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

রিমান্ড : সিনিয়র এএসপি আনিসুল করিম হত্যা মামলায় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের রেজিস্ট্রার ডা. আবদুল্লাহ আল মামুনকে মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শহিদুল ইসলামের আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদাবর থানার পুলিশ পরিদর্শক মো. ফারুক মোল্লা। পরে শুনানি শেষে বিচারক ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আদালতের সংশ্লিষ্ট থানার সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা পুলিশের উপ-পরিদর্শক মনির আহমেদ এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, আসামিপক্ষের আইনজীবী সাইফুল ইসলাম সোহেল রিমান্ড বাতিলের আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষ এর বিরোধিতা করে। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক আসামির ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

আরও দু’জনের স্বীকারোক্তি : সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আনিসুল করিম হত্যা মামলায় ফার্মাসিস্টসহ আরও দু’জন দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। এ নিয়ে এএসপি হত্যা মামলায় মোট ৬ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেন। মঙ্গলবার ফার্মাসিস্ট তানভীর হাসান ও মাইন্ড এইড হাসপাতালের ওয়ার্ডবয় তানিফ মোল্লা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মত হন। পরে তাদের আদালতে হাজির করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদাবর থানার পরিদর্শক (অপারেশন) ফারুক মোল্লা। তিনি আসামিদের জবানবন্দি রেকর্ড করার আবেদন জানান। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দেবব্রত বিশ্বাস তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

এর আগে গত ১৬ নভেম্বর মাইন্ড এইড হাসপাতালের মার্কেটিং ম্যানেজার আরিফ মাহমুদ জয় ও ওয়ার্ডবয় সজীব চৌধুরী এবং তার আগে ১৫ নভেম্বর শেফ মাসুদ খান এবং ওয়ার্ডবয় অসীম চন্দ্র পাল স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। বর্তমানে তারা কারাগারে আছেন।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Facebook Comments

সাম্প্রতিক খবর