শিরোনাম

যমযম কূপ ও কাবা নির্মানের ঘটনা।

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২১ ৯:৫০:৫৮ অপরাহ্ণ
মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের কে তাহার এবাদত করার মত অনেক মাধ্যম দিয়েছেন। তন্মাধ্যে হজ্জ হলো অন্যতম। আর হলো ইসলামের এক ঐতিহাসিক বিধান। শতাব্দির পর শতাব্দি নবী রাসূল (সা.) গণ হজ আদায় করে আসছেন। হজের সূচনাটাও হয়েছিল এক ঐতিহাসিক নিদর্শনের মাঝ দিয়ে। আর সে ইতিহাসের জনক হলেন নবী হজরত ইব্রাহীম (আ.) ও বিবি হাজেরা (আঃ) । তবে আদি মানব ও মানবী হজরত আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) ও হজ পালন করে এসেছেন। হজের কিছু কাজ তাদের অনুকরণে আজও মুসলিম জাতি পালন করে আসছে। 
Please click this link:https://hatbazar365.com/
হজের অধিকাংশ নিদর্শনাবলী হজরত আদম (আ.) ও বিবি হাওয়া (আ.) এর সঙ্গে জড়িত। তবে নবী ইব্রাহীম (আ.) ও স্ত্রীর হাজেরা (আঃ) এর কয়েকটি নিদর্শনাবলী ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে। হজের বড় নিদর্শনের মাঝে রয়েছে কাবা ঘর।  কাবা ঘর প্রথম নির্মাণ করেছিলেন কে? ফেরেশতাগণ না আদম (আ.)? এ নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে, ‘নিশ্চয়ই মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে গৃহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা তো মক্কায়, তা বরকতময় ও বিশ্বজগতের দিশারী’ (আলে ইমরান: ৯৬)। হযরত আদম (আঃ) কাবাঘর আল্লাহর আদেশে পুনঃনির্মাণ করেন। এরপর বহুদিন অতিক্রম হলো। শত শত বছর অতিবাহিত হগো। আল্লাহর বান্দারা কাবাঘর জিয়ারত করতো, আল্লাহর কাছে হাজিরা দিতো এ কাবা  ঘরে সমবেত হয়ে। কাবাঘরে এসে মহান আল্লাহর পবিত্রতা ও অংশীদারহীনতা ঘোষণা দিত। ‘লাববাইক আল্লাহুম্মা, লাববাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নেয়ামাতা, লাকাওয়াল মুলক, লাশারীকা, লাকা লাববাইক।’ এভাবে চলতে চলতে দিন গত হতে থাকলো। এরপর হযরত শীষ (আঃ) কাবাঘর পুনঃনির্মাণ করলেন।
video:https://www.youtube.com/watch?v=OPRlRgDkzbw&t=36s
দিন দিন একত্ববাদীর সংখ্যা বাড়তে থাকলো। এরপর কাবা শরীফ নির্মাণ বা পুনঃনির্মাণ করেন হযরত ইব্রাহীম (আঃ)। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) হযরত ইসমাঈল (আঃ)কে সাথে নিয়ে কাবাঘর নির্মাণ বা পুনঃনির্মাণ করেন। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কাবাঘর সংস্কার করে আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন। ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাদের উভযকে আজ্ঞাবহ কর। আমাদের বংশ থেকে একটি অনুগত দিন সৃষ্টি কর। নিশ্চয়ই তুমি দয়ালু। হে প্রতিপালক! তাদের মধ্য থেকেই তাদের কাছে একজন পয়গম্বর প্রেরণ করুন। যিনি তাদের কাছে তোমার আয়াত তেলাওয়াত করবেন। তাদেরকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দিবেন এবং পবিত্র করবেন। নিশ্চয়ই তুমি মহাপরাক্রমশালী।’ আল্লাহ রাববুল ইজ্জত হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশ হতে হযরত মুহাম্মদ (সা.)কে শেষ নবী ও রাসূল হিসেবে আল্লাহ পৃথিবীতে প্রেরণ করেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী অতিবাহিত হলো। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়ত প্রাপ্তির ৫ বছর আগে কাবাঘর সংস্কার করে মক্কার বিখ্যাত কোরাইশ বংশ। এ কুরাইশ বংশেই মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ৫৭০ খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। কুরাইশরা কাবা শরীফ সংস্কারের পর হাযরে আসওয়াদ স্থাপন নিয়ে মতভেদ দেখা দেয়। সকলের সম্মতিক্রমে আল্লাহর রাসূল কাবা গৃহে হাসরে আসওয়াদ স্থাপন করেন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) জীবিত অবস্থায় ৬ হিজরীতে আব্দুল্লাহ ইবনে জোবায়ের (রা.) কাবা শরীফ সংস্কার করেন। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ৭৪ হিজরীতে কাবা শরীফ সংস্কার করেন। সুদীর্ঘ ১৪শ’ বছরে কাবাগৃহে কোনো সংস্কারের প্রয়োজন হয়নি। শুধুমাত্র কাবাঘরের চারপাশে অবস্থিত মসজিদে হারামের পরিবর্ধন, সংস্কার বা সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। অনেক মুফাসসির মনে করেন, বসবাস ও ইবাদত উভয় দিক দিয়ে কাবা ছিলো মানবসভ্যতার প্রথম ঘর। ভিন্ন মতে, এটি ছিলো ইবাদতের নিমিত্ত নির্মিত প্রথম ঘর। আদম ও হাওয়া (আ.) দুনিয়ায় অবতরণের পর পৃথিবীর বিভিন্ন দিগন্তে যাত্রা করেন। অবশেষে মক্কায় তাদের মাঝে মিলন ঘটে। আরাফা, মুজদালিফা, মিনা ও হাজরে আসওয়াদের ইতিহাস তাদের সাথেই সম্পর্কিত। বলা হয়, আরাফায় আদম ও হাওয়ার মাঝে দুনিয়ায় অবতরণের পর প্রথম পরিচয় ঘটে। মুজদালিফায় তাদের মাঝে আলাপ সংঘটিত হয়।
মিনায় আদম (আ.) এর আকাংঙ্খা পূর্ণ হয়। তবে হজের সবচেয়ে হৃদয় বিদারক ও হৃদয়গ্রাহী গল্পটি হচ্ছে জমজম কূপের ইতিহাস। পবিত্র জমজম কূপের পানি পৃথিবীর সকল পানির চেয়ে উত্তম এবং পবিত্র। কাবাঘরের ইতিহাস ও জমজম কূপ একের সাথে অন্যটি জড়িত। ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা পবিত্র হজ কিংবা পবিত্র ওমরা পালন করার সময় একই কূপ থেকে পানি নিয়ে আসেন। ইসলাম ধর্মে জমজম কূপের পবিত্র পানির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। নবী হজরত ইব্রাহীম (আ.)। তিনি শিশু ইসমাঈল (আ.) সহ বিবি হাজেরা (আ.)-কে মক্কায় নির্বাসনে পাঠান, তখন থেকেই জমজম কূপের আবির্ভাব হয়। হজরত ইব্রাহীম (আ.) সিরিয়া থেকে মক্কায় পৌঁছলে বিবি হাজেরা (আ.) এবং দুধের শিশু হজরত ইসমাঈল (আ.)-কে মক্কার মরুভূমিতে রেখে সিরিয়ায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে করেন। তখন এক মশক পানি এবং একটি থলের মধ্যে কিছু খেজুর তাদের কাছে রেখে যান। হজরত হাজেরা (আ.) কয়েকদিন পর্যন্ত সে পানি ও খেজুর খেলেন এবং নিজের কলিজার টুকরা হজরত ঈসমাঈলকে দুধ পান করালেন। কিন্তু একসময় মশকের পানি ও খেজুর ফুরিয়ে এল। তিনি তখন এক চরম অসহায়তার মধ্যে নিপতিত হলেন। তার শিশু সন্তানটিও ক্ষুধার তাড়নায় ছটফট করতে থাকে। বিবি হাজেরা (আ.) সন্তানের দুর্দশায় তার আদরের দুলালকে দুধ পানে সমর্থ হলেন না। এমতাবস্থায় তৃষ্ণাকাতর মা পানির খোঁজে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে দ্রুতবেগে দৌঁড়াতে থাকেন। পরপর সাতবার দৌঁড়ানোর পরও কোনো পানি না পেয়ে মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মা হাজেরার দোয়া কবুল করেন। তখন পুত্রের কাছে গিয়ে দেখলেন আল্লাহর কুদরতে তার দুই পায়ের নিচে একটি পানির ফোয়ারা জেগে উঠেছে এবং তা ক্রমশ উথলে উঠছে ও প্রবাহিত হতে চাচ্ছে। হজরত বিবি হাজেরা তখন অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং চারদিকে পাড় বেঁধে পানি থামানোর চেষ্টা করলেন। তিনি পানিকে থামার নির্দেশ দিয়ে উচ্চস্বরে বলছিলেন ‘জমজম’ অর্থাৎ থেমে যাও। হজরত হাজেরার উচ্চারিত সে শব্দেই পৃথিবীর সবচাইতে পবিত্র এ কূপের নাম হয়ে যায় ‘জমজম’। ঐতিহাসিকরা মন্তব্য করেন, হজরত ইব্রাহীম (আ.) এর পর বিভিন্ন গোত্র ও সম্প্রদায় মক্কা নগরীতে মানববসতির সূচনা করে। তারা জমজম কূপের নিয়ন্ত্রণ করতো। ঠিক ওভাবেই জুবহাম গোত্রের লোকেরা জমজম কূপের নিয়ন্ত্রণ লাভ করে। জুবহাম গোত্রের লোকজন হজরত হাজেরা (আ.) এর সঙ্গে চুক্তিসাপেক্ষে জমজম কূপের পানি পান করতো। কালক্রমে তারা মক্কাঘরের পবিত্র মালামাল লুণ্ঠন ও চুরি করতে থাকে। তারা নানা পাপাচারে লিপ্ত হলো। ফলে মহান আল্লাহর হুকুমে এক সময় জমজম কূপের পানি শুকিয়ে যায়।
সংস্কারের অভাবে একসময় জমজম কূপের স্থান ভরাট হয়ে যায়। মানুষ এই কূপের বরকত ও কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হতে থাকে। খৃস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর সূচনাতে হজরত ইসমাঈল (আ.) এর বংশধর একজন দৃঢ়চেতা, আত্মপ্রত্যয়ী পুরুষের নেতৃত্বে কাবাগৃহের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কুরাইশরা ফিরে পায়। তাদের চতুর্দশ পুরুষ খাজা আবদুল মুত্তালিব জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন হজরত মুহাম্মাদ (সা.) এর দাদা। তখন আবদুল মুত্তালিব জমজম কূপ অনুসন্ধানে আগ্রহী ও উদ্যোগী হন এবং তার এক পুত্র যায়েদকে সাথে নিয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রাখেন। এক রাতে তিনি স্বপ্নে জমজম কূপের নিশানা খুঁজে পান এবং কূপটি দেখতে পান। স্বপ্নের চিহ্ন অনুযায়ী তিনি তার ছেলে হারেসকে সাথে নিয়ে কূপ খনন শুরু করেন এবং বাস্তবেই জমজম কূপ আবিষ্কারে সক্ষম হন। তখন থেকে আবারও মানুষ এ কূপের যত্ন নিতে শুরু করেন এবং এ বরকতময় পানির ধারা আজও প্রবাহিত রয়েছে। তাই আসুন আমরা মহান আল্লাহর নিকট দোয়া করি যেন তিনি আমাদের হজ্জ নসীব করেন এবং কাবার গিলাপ ও যমযম কূপ দেখার তাওফিক দান করেন। আমীন।

জে,এম ইউসুফ।

পরিচালক স্বাধীন-বাংলা ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

প্রিন্সিপাল আল-আমিন ইসলামিয়া মাদ্রাসা।

লক্ষ্মীপুর

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Facebook Comments

সাম্প্রতিক খবর

Contact Us