শিরোনাম

যুব সমাজের অবক্ষয়ের কারণ ও প্রতিকার

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২০ ২:১৩:২৯ পূর্বাহ্ণ
যুব সমাজের অবক্ষয়ের কারণ ও প্রতিকার
যুব সমাজের অবক্ষয়ের কারণ ও প্রতিকার

ভূমিকাঃ আজকের তরুণরাই আগামী দিনের দেশ ও জাতির কর্ণধার।তরুণ অর্থাৎ যুবসমাজই পারে শত বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে দেশকেস্বপ্নের দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে। তাই সুকান্ত ভট্টাচার্য তাঁর ‘আঠারোবছর বয়স’ কবিতায় বলেছেন-
‘পথ চলতে এ বয়স যায় না থেমে,
এদেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে।’

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, যুবসমাজ এখন বিপথে পরিচালিতহচ্ছে। যুবসমাজের অবক্ষয়ের কারণে জাতি হতাশায় নিমজ্জিত।যুবসমাজের অবক্ষয় জাতির বুকে গভীর ক্ষত তৈরি করছে। গোটাসমাজকে ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে। আর এই সমস্যারপ্রতিকার না হলে দেশ ও জাতি ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হবে।

যুবসমাজ ও অবক্ষয়ঃ অবক্ষয় শব্দের আভিধানিক অর্থ হলোক্ষয়প্রাপ্তি। মানবজীবনকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করতে হলে কিছু গুণেরপ্রয়োজন হয়। আর মানুষের এই গুণগুলি যখনই লোপ পায় বা নষ্ট হয়তখনই শুরু হয় নৈতিক অবক্ষয়। কোনো একটি দেশের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হলো যুবসমাজ। তারা কখনও পরাজয় মেনে নেয় নাএবং পুরাতনকে নতুন করে গড়তে চায়। কিন্তু এই যুবসমাজ যখন খারাপপথে ধাবিত হয় তখন সমাজের মধ্যে নানা সমস্যা দেখা যায়।যুবসমাজের অবক্ষয়ের কারণে জাতীয় জীবনে নেমে আসে চরম দুঃখ-দুর্দশা, বিপর্যয় ও হতাশা।

যুবসমাজের অবক্ষয়ের কারণঃ আমাদের দেশের যুবসমাজ আজ নানাধরণের নৈতিক অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে। নিম্নে যুব সমাজের অবক্ষয়েরপ্রধান কারণগুলো বর্ণনা করা হলো-

মূল্যবোধের অভাবঃ জীবনে সৎ, সুন্দর, কল্যাণকর ও শান্তির মাধ্যমেবেঁচে থাকতে হলে কতগুলো গুণের প্রয়োজন হয়। আর এই সব গুণকেইসাধারণত মূল্যবোধ বলা হয়। সামাজিক ও ধর্মীয় এসব মূল্যবোধযুবসমাজকে সত্য, সুন্দর ও মঙ্গলের দিকে পরিচালিত করে। বর্তমানসমাজে এ সকল মূল্যবোধের অনুশীলন ক্রমশই হ্রাস পাচ্ছে। ফলেযুবসমাজ বিপদগামী হচ্ছে।

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবঃ ১৯৭১ সালে আমাদের দেশ স্বাধীনহয়। ১৯৭৫ সাল থেকে আমাদের দেশে ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে নানাধরণের অস্থিরতা বিরাজ করছে। এখনও বাংলাদেশ রাজনৈতিকঅস্থিরতা থেকে মুক্ত হতে পারেনি। বাংলাদেশের রাজনীতি ধীরে ধীরেপেশিশক্তি নির্ভর হয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েলকরার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন বিপথগামী তরুণদের ব্যবহারকরছে। আবার বিপথগামী তরুণরা কেন্দ্রীয় এবং জাতীয় নেতাদের প্রশ্রয়পেয়ে আরো বেপরোয়া হয়ে যায়। দুর্বল অর্থনৈতিক সমাজব্যবস্থাও যুবসমাজের অবক্ষয়ের জন্য অনেকাংশে দায়ী। আমাদের সমাজের অনেকছেলেমেয়ে আছে যারা অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে লেখাপড়া করতেপারে না। এতে তারা শিক্ষার অভাবে নানা কুসংস্কার দ্বারা আচ্ছন্ন হয়এবং বিপথে ধাবিত হয়। তাই অর্থনৈতিক অভাবের কারণে যুবসমাজতাদের নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে।

অপসংস্কৃতির প্রভাবঃ আমাদের সমাজের তরুণদের অবক্ষয়ের অন্যতমকারণ হলো বিদেশি সংস্কৃতির নামে এক ধরণের অপসংস্কৃতির প্রসার।বর্তমানে আমাদের চলচ্চিত্রের অশ্লীল নাচ, গান, সংলাপ যুবসমাজকেক্রমান্বয়ে গ্রাস করে ফেলছে। ডিশ এন্টেনার প্রভাবে বিদেশি অপসংস্কৃতিআমাদের যুবসমাজকে চেপে ধরেছে। তাছাড়া রুচিহীন পোশাক-পরিচ্ছদও অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ।

বেকারত্ব ও মাদকাসক্তির প্রভাবঃ আমাদের দেশের যেসব তরুণ-তরুণীলেখাপড়া শেষ করে চাকরি পায় না তারা নানা রকম মানসিক হতাশায়ভোগে। চাকরির অভাবে তারা অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। দীর্ঘ সময় এইঅবস্থা চলতে থাকলে তাদের ভেতরে ক্ষোভ জন্ম নেয়। আর এই ক্ষোভথেকেই তারা চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, হত্যা ও অপহরণসহ নানা পাপকাজে লিপ্ত হয়। আবার কোনো দেশের যুব সম্প্রদায় মাদকাসক্ত হওয়ামানে নৈতিক চরিত্রের চূড়ান্ত অধঃপতন। ফেনসিডিল, গাঁজা, আফিম, ভাং ইত্যাদি মাদকদ্রব্য সর্বত্র পাওয়া যায়। আর এ সুযোগ গ্রহণ করেযুবসমাজ ধ্বংস হচ্ছে।

শিক্ষাঙ্গনের প্রভাবঃ শিক্ষা ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা ও বিশৃংখলা অনেকসময় ছাত্র-ছাত্রীদের বিপথে পরিচালিত করে। ভর্তির সমস্যা, পরীক্ষাপিছিয়ে নেওয়া, ফল প্রকাশের বিলম্ব, সেশনজট এবং যখন তখন ধর্মঘটইত্যাদি ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে মানসিক বিপর্যয় সৃষ্টি করে। তাছাড়া যে সবপ্রতিষ্ঠানে বোমাবাজি, ককটেলবাজি এবং মারামারি লেগেই থাকে সেসবপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের মনে সব সময় ভয়-ভীতি কাজ করে। আবারকখনও দেখা যায় যে, গুটিকয়েক সন্ত্রাসী সমস্ত ছাত্র সমাজকে জিম্মিকরে রাখে।

যুবসমাজের অবক্ষয়ের প্রতিকারঃ কোনো দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে যুবসমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকরে। তাই যুবসমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরিবিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিম্নে যুব সমাজের অবক্ষয়ের কিছু প্রতিকারসম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

পারিবারিক মূল্যবোধঃ প্রতিটি মানুষই কোনো একটি পরিবারে জন্মগ্রহণকরে।

শিক্ষার প্রসার ও শিক্ষাঙ্গণের সমস্যা সমাধানঃ আধুনিক সমাজব্যবস্থায়সুন্দরভাবে জীবনযাপনের অন্যতম শর্ত হলো শিক্ষা। তাই যুবসমাজকেঅন্ধকার থেকে মুক্তির জন্য শিক্ষিত করা প্রয়োজন। দেশের প্রতিটি গ্রামেশিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া উচিত। আবার যে সব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাব্যবস্থায় ত্রুটি রয়েছে সেগুলো সমাধান করা উচিত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেপড়াশুনার উপযুক্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে সেশনজট নিরসনএবং উপযুক্ত সময়ে একাডেমি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পরীক্ষা নিতে হবে।এতে যুবসমাজের অবক্ষয় রোধ হবে।

বেকারত্ব হ্রাস ও দারিদ্র বিমোচনঃআমাদের দেশের অনেক যুবকইবেকার। তাদের উৎপাদনশীল কাজে জড়িত করতে পারলে বেকারত্ব হ্রাসপাবে। আর বেকারত্ব হ্রাস পেলেই যুব সমাজের অবক্ষয়ও কমে যাবে।আবার যুব সমাজের অবক্ষয় থেকে মুক্তি লাভ করতে দরিদ্রতা দূর করতেহবে। দরিদ্র যুবকদের বিভিন্ন খাতে উৎপাদনশীল করে তোলার জন্যসরকারকে বিনা সুদে ঋণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

ধর্মীয় মূল্যবোধঃ ধর্মীয় মূল্যবোধই পারে মানুষকে সঠিক পথেপরিচালিত করতে। যুব সমাজের বিরাট একটা অংশ ধর্মীয় মূল্যবোধথেকে দূরে সরে আছে। তাই যুবসমাজকে অবক্ষয় থেকে মুক্তির জন্যধর্মীয় শিক্ষা অপরিহার্য।

সংস্কৃতির অবাধ প্রসার রোধঃ যুব সমাজের অবক্ষয়ের পেছনে সবচেয়েবেশি প্রভাব বিস্তার করে অপসংস্কৃতি। যুবসমাজের বিশাল অংশ এখনবিদেশি সংস্কৃতির প্রতি ধাবিত হচ্ছে। এতে করে তাদের রুচি বিকৃত হয়েযাচ্ছে। তাই শিক্ষামূলক এবং সপরিবারে দেখার মতো চ্যানেলগুলোরেখে বাকি চ্যানেলগুলো বন্ধ করার জন্য সরকারের পদক্ষেপ নিতে হবে, নিজেদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করতে সচেষ্ট হতে হবে।

অবক্ষয়কে একটি ভয়াবহ ব্যাধি বলা যায়। বর্তমানে এই ব্যাধিযুবসমাজকে গ্রাস করে ফেলছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে জাতিরভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে। তাই যুবসমাজকে অবক্ষয়ের হাত থেকেরক্ষা করার জন্য আমাদের সকলেরই এগিয়ে আসা উচিত। যুবসমাজসচেতন হলে দেশ ও জাতির উন্নয়ন সম্ভব হবে।

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Facebook Comments

সাম্প্রতিক খবর