শিরোনাম

রায়হানের শরীরে মিললো ১১৩টি আঘাতের চিহ্ন। তার মধ্যে হাতে দুটি নখ উপড়ানো আর লাঠির আঘাতে চামড়া ছিলে যাওয়ার ১৪টি জখম

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : মঙ্গলবার, অক্টোবর ২০, ২০২০ ১১:০৯:০৩ পূর্বাহ্ণ
রায়হানের শরীরে মিললো ১১৩টি আঘাতের চিহ্ন। তার মধ্যে হাতে দুটি নখ উপড়ানো আর লাঠির আঘাতে চামড়া ছিলে যাওয়ার ১৪টি জখম
রায়হানের শরীরে মিললো ১১৩টি আঘাতের চিহ্ন। তার মধ্যে হাতে দুটি নখ উপড়ানো আর লাঠির আঘাতে চামড়া ছিলে যাওয়ার ১৪টি জখম

মানুষরূপী অমানুষ পুলিশের এসআই আকবরের নির্যাতনে রায়হান হত্যাকাণ্ডের পর সিলেটের আখালিয়া এলাকায় আজ শুধুই বিষন্নতা। নেই প্রাণচাঞ্চল্য। কারো মুখেই নেই কথা, নেই সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা।

কিছু সময় পর পর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে মা সালমা বেগমের আহাজারি আর স্ত্রী তাহমিনা তন্নীর কান্নার রোল। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে দুইমাস বয়সি শিশুকন্যা আলফা। এ যেনো এক হূদয় কাড়া দৃশ্যপট।

সহমর্মিতা জানাতে যারাই আসছেন— তাদের মনে একরাশ প্রশ্ন, মাত্র ১০ হাজার টাকার জন্য পুলিশ ফাঁড়িতে ধরে নিয়ে একটি তাজা প্রাণ কিভাবে কেড়ে নিলো এসআই আকবর। আবার নজরদারি আর নির্দেশনা উপেক্ষা করেই আত্মগোপনেও চলে যায় আকবর, অথচ এখনো নির্বিকার পুলিশ, বলছে পিবিআই বিষয়টি দেখছে।

এদিকে গ্রেপ্তারের দাবিতে অগ্নিগর্ভে পরিণত হচ্ছে সিলেট। জনমনে বাড়ছে ক্ষোভ। সে ক্ষোভের মাত্রা আরও কয়েকগুণ বেড়েছে রায়হানের ফরেনসিক রিপোর্টের তথ্যে। অর্থলোভী এসআইয়ের নির্মম-নিষ্ঠুর নির্যাতনে ১১৩টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে রায়হানের শরীরে। যেসব আঘাত লাঠির আঘাতে হয়েছে।গতকাল রোববার  রায়হানের বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন করে এসআই আকবরসহ জড়িত পুলিশ সদস্যদের গ্রেপ্তার দাবিতে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে রায়হানের পরিবার ও এলাকাবাসী।

তারা বিচার বিভাগীয় তদন্তসহ জড়িত বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ দোষী সব পুলিশ সদস্যকে অবিলম্বে গ্রেপ্তারসহ ছয় দফা দাবিও জানিয়েছেন। পাশাপাশি বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার না করা হলে এলাকাবাসীর উদ্যোগে হরতাল, সড়ক অবরোধসহ কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেয়া হয়।

রায়হানের মা সালমা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে কোনো দল করতো না। তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমার একটাই দাবি, আমার ছেলের হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই। রায়হান একটি ডাক্তারের চেম্বারে কাজ করতো। কে বা কারা তাকে বন্দরবাজার ফাঁড়িতে নিয়ে যায়।

সেখানে তাকে নির্যাতন করা হয়। ভোরে তৌহিদের মোবাইল থেকে রায়হান ফোন করে বলে তাকে বাঁচাতে। সে জানায় ১০ হাজার টাকা নিয়ে থানায় যেতে। ভোরে বন্দরবাজার ফাঁড়িতে গেলে রায়হানের চাচাকে দেখা করতে না দিয়ে সকালে আসতে বলেন। সকালে গেলে রায়হানের শরীর খারাপ করেছে এবং মেডিকেল যেতে বলে। হাসপাতালে সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তন্নি বাদি হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা দিতে গেলে পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করে। পরে উপ-পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করা হয়। মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) গেলে আমরা আশাবাদী হলেও এখন মামলার ভবিষ্যত অন্ধকার দেখতে পাচ্ছি। তাই তাদের আইনের আওতায় না আনলে কঠোর আন্দোলনে নামবো আমরা।’

রায়হানের মা বলেন, ‘১০ হাজার টাকা জন্য আমার ছেলেকে হত্যা করা হবে, এটা আমি বিশ্বাস করি না। নিশ্চয়ই আরও বড় কোনো গ্যাং জড়িত রয়েছে। ১০ হাজার কেন ৫০ হাজার টাকা চাইলেও আমি দিয়ে দিতাম।’

তিনি বলেন, ‘ক্ষতিপূরণ বলতে আমি একটাই চাচ্ছি আমার ছেলের হত্যাকারীদের প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়া হোক। কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিলেও আমার ছেলেকে ফিরে পাবো না। ক্ষতিপূরণ একটাই আমার, ছেলে হত্যার ফাঁসি চাই।’

এদিকে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে কোথায় পালালেন আকবর? এ প্রশ্নের জবাব খুঁজছেন রায়হানের পরিবারসহ সিলেটের সর্বস্তরের মানুষ ও সকল রাজনৈতিক দলের নেতারা। এ ইস্যুতে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে আজ একাট্টা সিলেটবাসী।

জেলা প্রশাসকের হাতে স্মারকলিপি দিয়েছে। রায়হানের দুই মাসের শিশুকন্যা আলফা নির্বাক। নির্যাতন নির্মমতার চিত্র তুলে ধরেছেন সে রাতের সিএনজি চালকও। ঘৃণিত ঘটনার দায়ে আইনজীবীরাও সোচ্চার।

তারাও দাঁড়াবেন না হত্যা নায়কদের পাশে। পলাতক এসআই আকবরকে ধরতে ইমিগ্রেশনে চিঠি পাঠিয়েছে পিবিআই। তবুও অধরা এসআই আকবর। সে কারণে ক্ষোভে জমছে আমজনতার। গ্রেপ্তার না হওয়ায় সন্দেহ আর অবিশ্বাসের ডালপালা কেবল বিস্তৃতই হচ্ছে।

এরই মধ্যে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হওয়া রায়হানের প্রথম দফার ময়নাতদন্ত রিপোর্টে প্রকাশ পেলো রায়হানের ওপর চলা সেই রাতের নির্মমতার নমুনা। ১১৩টি আঘাতের মধ্যে লাঠির আঘাতের কারণে চামড়া ছিলে যাওয়ার ১৪টি জখম পাওয়া গেছে। দুটি আঙুলের নখ উপড়ে ফেলাসহ পুরো শরীরে শুধু লাঠির আঘাতই রয়েছে ১১৩টি। নির্যাতনের সময় রায়হানের পাকস্থলিও খালি ছিলো।

ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. শামসুল ইসলাম বলেন, ‘প্রথম দফার ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। রিপোর্টে রায়হানের শরীরে ১১৩টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

এর মধ্যে শরীরের রয়েছে ১১১টি ও হাতের দুটি নখ উপড়ানোসহ মোট ১১৩টি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। লাঠি দিয়ে আঘাত করায় রায়হানের শরীরের রগগুলো মারাত্মভাবে জখম হওয়ায় ভেতরে রক্ত জমাট বেঁধে যায়।

তিনি আরও বলেন, একের পর এক লাঠির আঘাতের কারণেই রায়হানের পুরো শরীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতিটি আঘাত ছিলো ?খুবই গুরুতর। অতিরিক্ত আঘাতের কারণে রায়হানের হূদযন্ত্র রক্ত পায়নি। সে জন্য তার মৃত্যু হয়। লাঠির আঘাতের কারণে হাইপোভলিউমিক শক ও নিউরোজেনিক শকে মস্তিষ্ক, হূৎপিণ্ড, ফুসফুস, কিডনিসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো কর্মক্ষমতা হারায়। আঘাতের সময় রায়হানের পাকস্থলি একেবারেই খালি ছিলো। সেখানে ছিলো শুধু এসিডিটি লিকুইড।

সুশীল সমাজের অনেকেই বলেছেন, একজন আকবরের দায় কেন গোটা পুলিশ বাহিনীকে বহন করতে হবে। এসআই আকবরসহ সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তার ও বিচারের মুখোমুখি করে পুলিশ বিভাগ দায়মুক্ত হোক।

এদিকে বিভিন্ন স্থানে রায়হান হত্যার প্রতিবাদে সমাবেশ ও মানবন্ধন কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবাদকারীরা বলেন, রায়হান হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় না আনা পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বেন না।

তারা বলছেন, ফাঁড়ি পরিচালনায় এসআই আকবরের কর্মকাণ্ডের ওপর রহস্যজনক কারনে নজরদারি ছিলো না সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের। কেউ কেউ বলছেন, নির্যাতন করে মানুষের কাছ থেকে আদায় করা টাকার ভাগ বড় কর্তারাও পেতেন।

যে কারণে তার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখেনি এসএমপি কর্মকর্তারা। আর সে সুযোগে ফাঁড়িকে থানা আর নিজেকে ওসি ভেবে মানুষের ওপর এতদিন চালিয়েছেন নিষ্ঠুর-নির্মম নির্যাতন। সর্বশেষ তার নির্যাতনের শিকার হয়েই মারা যায় রায়হান।

ড্রেস রুলের তোয়াক্কা করেনি এসআই আকবর!
পুলিশ বিধিও তোয়াক্কা করেননি এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই পুলিশের পোশাকে-সাদা পোশাকে নেমেছিলেন অভিনয়ে। সরকারি চাকরিজীবী হয়েও অর্থ উপার্জনে আঞ্চলিক ভাষায় নির্মিত নাটকে অভিনয়ে নেমেছিলেন। ইউটিউব চ্যানেল গ্রিন বাংলার হয়ে অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেছেন। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতিও নেননি। এসএমপি কর্তৃপক্ষও তার অভিনয়ের বিষয়ে কিছুই জানেন না।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, অভিনয় জগতে নেমে এসআই আকবরের অধপতন ঘটে। রায়হানকে নির্যাতন করে হত্যার পর বেরিয়ে আসে অভিনয় জগতে জড়িতদের সঙ্গে আখালিয়া এলাকায় রাত-বিরাতে আড্ডা বসানোর বিষয়টি। সেসব আড্ডার মধ্যমনি থাকতেন আকবর। চলতো সরাব ও ইয়াবা সেবন। পুলিশ কর্মকর্তা হওয়াতে স্থানীয়রা প্রতিবাদ করতেও ভয় পেতেন।

এক পর্যায়ে ফাঁড়িতে বসেও ইয়াবা সেবন শুরু করেন, এমন অভিযোগ করেন তার অধীনস্থ পুলিশ সদস্যরাও। ফাঁড়ির দায়িত্ব থাকাকালে মানুষকে ধরে এনে নির্যাতন ও অপরাধ অপকর্ম করে টাকা আদায়ের পাশাপাশি ড্রেসরুল লঙ্ঘনের বিষয়টিও এখন আলোচনায় উঠে আসছে।

পুলিশের হেফাজত থেকে পুলিশ সদস্যের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা নাটকের অংশ : সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘পুলিশের হেফাজত থেকে পুলিশ সদস্যের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা নাটকের একটি অংশ।’

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘এখন নিরাপত্তা কোথায় রয়েছে। এই ঘটনায় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পক্ষপাতিত্ব আচরণ করেছেন পুলিশের সঙ্গেই। বরখাস্ত ও প্রত্যাহার হওয়া পুলিশ সদস্য ও এসআই আকবরকে তারাই পালাতে সুযোগ করে দিয়েছেন। এটা পুলিশের ব্যর্থতা। উদাসীনতার অংশ।

রায়হানের মায়ের স্বপ্নভঙ্গ : দায়ী আকবর  : ‘এসআই আকবরসহ তার সহযোগীরা আমার সব স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে’—এমন এমন মন্তব্য করে আক্ষেপের সুরে মাথা চাপড়ে নিহত রায়হানের মা সালমা বেগম বলেন, অনেক কষ্ট করেছি ছেলেমেয়েদের নিয়ে। যখন সুখের স্বপ্ন দেখছিলাম, তখনই সব শেষ করে দিলো। তিনি বলেন, কদিন পরই হয়তো রায়হান আমেরিকাবাসী হতো। কিন্তু সব তছনছ করে দিছে আকবর।’

তিনি বলেন, ‘আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই। এরা পুলিশ নামের কলঙ্ক। আমি ছেলে হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।’ সূত্র জানায়, রায়হানের পিতা মৃত রফিকুল ইসলাম ছিলেন বিজিবির সৈনিক পদে কর্মরত। রায়হান যখন তার মায়ের গর্ভে (সাত মাসের) ছিলেন তখন তার বাবা চাকরিরত অবস্থায় বিজিবি ক্যাম্পেই মারা যান। এরপর থেকে শুরু হয় রায়হানদের পরিবারে টানাপড়েন। পরিবারটির প্রতি সহায়তার হাত বাড়ান স্বজনরা।

নিহত রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তন্নি বলেন, জীবনটাই শেষ হয়ে গেলো। অনটন থাকলেও সংসার ছিলো বেশ সুখের। সুখটা নষ্ট করে দিলো পুলিশ। মেয়েটাকে জীবনের জন্য পিতৃহারা করে দিলো।’

তিনি বলেন, ‘আমি স্বামী হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই’।

নিরীহ মানুষকে ধরতেন আশেক, নির্যাতন করতেন এসআই আকবর : রায়হানকে হত্যার পর থেকেই বেরিয়ে আসছে আকবরের দুর্নীতি ও মানুষ নির্যাতনের নানা তথ্য। এ কাজে তার অন্যতম সহযোগী এএসআই আশেক এলাহী। রায়হানকেও ধরে এনেছিলেন আশেক এলাহী।

জানা গেছে, প্রথমে ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়ার আগে সিএনজিতে তুলে কৌশলে টাকা আদায়ের চেষ্টা করতেন এলাহী। টাকা আদায় সম্ভব না হলে নিয়ে যেতেন ফাঁড়িতে। সেখানে শায়েস্তা করার দায়িত্ব ইনচার্জ আকবরের। প্রথমে চড়-থাপ্পড় দিয়ে শুরু হতো আকবরের অ্যাকশন। চলতো টাকা আদায় না হওয়া পর্যন্ত। শায়েস্তা করার প্রথম কাজটি করতেন আকবর নিজে।

এর পরের দায়িত্ব পড়তো কনস্টেবল তৌহিদের কাছে। সমপ্রতি তেমনই হয়রানি আর নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন সুনামগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধার সন্তান নুরুল ইসলাম। সিলেট নগরীর মিতালি ম্যানশনে খালার সাথে থাকতেন রাজমিস্ত্রি নুরুল ইসলাম।

সমপ্রতি এক রাতে খালার বাসার জন্য সস্তায় মাছ কেনার জন্য রাত প্রায় সাড়ে ১১টায় বন্দরে গেলে তাকে ধরে নিয়ে যান এএসআই আশেক এলাহী। এ সময় তার কাছাকাছি থেকে আরও দুইজনকে ধরে নিয়ে যান বন্দর ফাঁড়িতে। এরপর সকলকে হস্তান্তর করা হয় বন্দর ফাঁড়ির সদ্য বহিষ্কৃত ইনচার্জ এসআই আকবরের কাছে। প্রথমেই কয়েকটি চড়-থাপ্পড় মারেন আকবর। পরে ডাকা হয় কনস্টেবল তৌহিদকে।

বলেন, ‘লাঠি নিয়ে আয়’। হুকুম পেতেই লাঠি নিয়ে হাজির তৌহিদ। লাঠি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সন্তান দিনমজুর নুরুল ইসলামকে কয়েকটি আঘাত করেন তৌহিদ। এরপর একটি বিশেষ ধরনের চাকু নিয়ে এলেন আরও এক কনস্টেবল। ধরিয়ে দিলেন নুরুলের হাতে। তাতেই গল্প শুরু। ‘১০ হাজার দে, না হয় কোর্টে চালান করে দেয়া হবে’ বলে জানান তৌহিদ।

পরে নুরুল ফোন দেন তার খালার কাছে। অসহায় খালা ধারদেনা করে কোনোরকম সাত হাজার টাকা জোগাড় করে মানুষ পাঠিয়ে নুরুল ইসলামকে ছাড়িয়ে আনেন বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন নুরুল ইসলাম নিজেই। কেবল নুরুল ইসলাম নয়, বাদ পড়েননি সরকারি চাকরিজীবী, পর্যটক কেউই।

রাতে তাদের এক কৌশল হলেও ভোর হওয়ার সাথে সাথেই সুরমা মার্কেট পয়েন্ট, চৌহাট্টা পয়েন্ট, কোর্ট পয়েন্টে বসতো বন্দরবাজার ফাঁড়ির চৌকস অভিযান। টার্গেট থাকতো এক সাথে থাকা তরুণ-তরুণী। সুযোগ বুঝেই তাদের আটক করে চলতো ভয়ভীতি প্রদর্শন।

কাউকে আবার ফাঁড়িতেও নিয়ে আসা হতো। চলতো খারাপ ভাষায় কথা বলা। সব মিলে টাকা আদায়ের সূক্ষ্ম এ কৌশলটি পালন করতেন মূলত আশেক এলাহী। বিশেষ করে শাহজালাল (র.) মাজারে আসা ও পর্যটকদেরকেই বেশি টার্গেট করতেন তারা।

অবশ্য বেশ কিছুদিন আগে সিলেটের চৌহাট্টা এলাকায় স্বামীসহ পুলিশের হয়রানির শিকার হয়ে ফেরার পথে ফেসবুকে একটি পোস্টও দিয়েছিলেন এক নারী। সে সময় গণমাধ্যমসহ সকল মহলেই বেশ সমালোচিত হয়েছিল বিষয়টি।

এভাবে নিরীহ মানুষদের ধরে নিয়ে গেলে কারো স্বজনরা সরাসরি টাকা নিয়ে আসতেন। আবার কখনো বিকাশ নাম্বারে আসতো টাকা। সুরমা মার্কেটের ক্বিন ব্রিজ লাগোয়া একটি কম্পিউটার প্রিন্ট অ্যান্ড কম্পোজের দোকান মালিকের পার্সোনাল নম্বরেই আসতো সেই টাকা। বন্দর ফাঁড়িতে এভাবেই চলতো দিনের পর দিন মানুষকে হয়রানি আর নির্যাতন।

ভিআইপি রুমটিই ছিলো এসআই আকবরের টর্চার সেল : বন্দর ফাঁড়ির মাঝখানের ভিআইপি কক্ষটিই টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করতেন এসআই আকবর। গায়ের জোরেই ফাঁড়ি চালাতেন আকবর। টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে প্রতিদিন ফাঁড়িতেই সালিশ বসাতেন।

তার আধিপত্য ছিলো বন্দরবাজার এলাকাজুড়ে। বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ি ছিলো আকবরের কাছে থানার মতোই। ইনচার্জ হয়েও তার ভাব ছিলো থানার ওসির মতোই। উনিশ থেকে বিশ হলেই ফাঁড়ির ওই টর্চার সেলে চলতো নির্যাতন।

সেই টর্চার সেলকে বলা হতো আকবরের ‘ভিআইপি রুম’। আকবরের এই টর্চার সেলে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বন্দরবাজার এলাকার হকাররা। চাকরির পরোয়া না করেই অবৈধ টাকার পেছনে ছোটাই ছিলো তার একমাত্র কাজ। সোর্স আর লাইনম্যানদের দিয়ে শুধু বন্দরবাজার ফাঁড়ি থেকেই প্রতি মাসে আকবরের অবৈধ আয় ছিলো পাঁচ লাখ টাকা। কাজ না করেই অবৈধ টাকা দিয়ে আশীর্বাদ নিতেন পুলিশের বড় কর্তাদেরও।

গত প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে ফাঁড়ির পাশের ভবনে থাকেন হাসান নামের এক ব্যক্তি। সাড়ে তিন বছরে অনেক মানুষের চিৎকার শুনেছেন তিনি। শুনেছেন নির্যাতন থেকে বাঁচতে মানুষের আকুতি। কিন্তু কিছুই করার ছিলো না তার। ঝামেলায় জড়ানোর ভয়ে এড়িয়ে যেতেন তিনি। রায়হানকে ধরে আনার রাতেও টর্চার সেল থেকে চিৎকার চেঁচামেচি শুনেছেন তিনি।

গত কয়েক মাস আগে ঠিক একই রকমভাবে ১২ বা ১৩ বছরের একটি ছেলেকে তারা খুব মেরেছে। হাসানের এক আত্মীয় সিলেট সাবরেজিস্ট্রার অফিসের কর্মচারী, নাম খোকন। তাকেও গত প্রায় তিন মাস আগে ফাঁড়িতে তুলে এনেছিল, নিয়েছিল আশেক এলাহী। তার অপরাধ রাত করে বন্দর ফাঁড়ির সামনে দিয়ে বাড়ি ফিরছিল। আশেক এলাহী তাকে ডাক দিয়ে ফাঁড়িতে নিয়ে যান।

ভেতরে নিয়ে আকবরকে আশেক এলাহী বলেন, লোকটাকে তার সন্দেহ হয়েছে। তখন আকবর শুরু করেন মানসিক নির্যাতন। এরপর তৌহিদকে ডাকা হয়। তৌহিদ এসে শরীর তল্লাশি করার জন্য খোকনকে অন্য একটি কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে তৌহিদ ও আরও এক কনস্টেবল মিলে প্রস্তাব করেন টাকা ১০ হাজার আনানোর। না হলে গাঁজার পুটলি দিয়ে চালান করা হবে।

পরে খোকন তার বাড়িতে ফোন করলে হেতিমগঞ্জ এলাকার নিমাদল থেকে খোকনের স্ত্রী পান্না বেগম ১০ হাজার টাকা নিয়ে এসে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান। বিষয়টি রায়হানের মৃত্যুর পর প্রকাশ করার দুঃসাহস দেখিয়েছেন তারা।

স্থানীয়রা বলেন, কোনো ছেলেমেয়েকে এক সাথে দেখলেই তারা ধরে ফাঁড়ির ভেতরে নিয়ে যায়। ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী কোনো বাছবিচার ছিলো না। এ ছাড়াও বন্দরবাজার ফাঁড়িকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত দুই শিফটে চলতো হকারদের ব্যবসা।

সিটি কর্পোরেশন উচ্ছেদ করলেও এসআই আকবররা টাকা নিয়ে হকারদের রাস্তায় বসিয়ে দেয়। প্রতিটি হকারের কাছ থেকে ব্যবসা বুঝে আদায় করা হয় ৩০-৫০ টাকা। এই এলাকার রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে প্রতিদিন দেড় শতাধিক হকার ব্যবসা করেন।

ছিনতাইকারীদের কাছ থেকেও টাকা আদায় করতেন এসআই আকবর। সবচেয়ে বেশি টাকা নিতেন সিলেটের আপা সিন্ডিকেটের কাছ থেকে। এই চক্রের মূল হোতা পপি, মুন্নি, স্বপ্না ও মালা। চক্রটি সিলেটের বিভিন্ন মার্কেটে নারী ও পুরুষদের বেকায়দায় ফেলে মোবাইল ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নিতো। আকবর খবর পেলে আর রেহাই পেতো না পপি সিন্ডিকেটের সদস্যরা।

যতক্ষণ না আকবরকে টাকা না দেয়া হতো ততক্ষণ আকবরের সোর্সরা তাদের খুঁজতো। টাকা পেলে সব অপরাধ মাফ। সুরমা মার্কেটের দুইটি, মহাজনপট্টি ও কালিঘাটের দুইটি এবং জিন্দাবাজারের দুইটি হোটেলে গোপনে চলতো দেহব্যবসা।

প্রতিটি হোটেল থেকে মাসে পাঁচ হাজার করে টাকা দিতে হতো আকবরকে। সিলেট নগরীর তালতলা, লালদীঘিরপাড়, কাস্টঘর ও মির্জা জাঙ্গালের জুয়া ও মাদকের স্পট থেকে এসআই আকবর প্রতি সাপ্তাহে তিন হাজার টাকা করে আদায় করতেন।

অভিযোগ রয়েছে, কোনো কাজে আকবরের কাছে গেলে তিনি টাকা ছাড়া কথাই বলতেন না। রায়হান হত্যার পর এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ (কনস্টেবল হারুনুর রশীদ, কনস্টেবল তৌহিদ মিয়া, কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস) চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও এখনো গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি কাউকে।

এছাড়া তিন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে এ ঘটনায়। প্রত্যাহারকৃত পুলিশ সদস্যরা হলেন— যিনি রায়হানকে ধরে এনেছিলেন এএসআই আশিক এলাহী, এএসআই কুতুব আলী, কনস্টেবল সজিব হোসেন।

তবে মূল অভিযুক্ত আকবরকে খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ। এ ঘটনায় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল। এমনকি সাময়িক বরখাস্ত আর প্রত্যাহার এটি ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার একটি কৌশল বলে মন্তব্য করেছেন সিলেটবাসী।

স্থানীয়রা বলছেন, এসএমপি কমিশনারের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। কোনো অবস্থায় উনি দায় এড়াতে পারেন না। ওনারাই আকবরকে সরে যাওয়ার পথ তৈরি করে দিয়েছেন। তা না হলে আশেকসহ অন্য যারা আছে তাদের প্রত্যেককে গ্রেপ্তার করা হোক।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (গণমাধ্যম) বিএম আশরাফ উল্লাহ তাহের বলেন, আকবর ছাড়া বাকি সবাইকে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে। প্রত্যেকেই নজরদারিতে আছেন।

আর আশেক এর ক্ষেত্রে যেসব তথ্য জানালেন তা ক্ষতিয়ে দেখা হবে। মূলত সামগ্রিক বিষয় বিবেচনায় আছে। তাছাড়া মামলা যেহেতু পিবিআই তদন্ত করছে সে ক্ষেত্রে তারাই তদন্ত করে পদক্ষেপ নেবে।

 

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Facebook Comments

সাম্প্রতিক খবর