শিরোনাম

লাশকাটা ঘরে তিন দশক, প্রথম দিকে রামপ্রসাদ ভয়ে কুঁকড়ে যেতেন, রামপ্রসাদ

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : মঙ্গলবার, নভেম্বর ১৫, ২০২২ ২:১১:৪৫ অপরাহ্ণ

১৯৯১ সালে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ডোম হিসেবে চাকরিজীবন শুরু করেছিলেন রামপ্রসাদ। এর আগে টানা তিন বছর বাবা মতিলালের কাছে শিখেছেন কেমন করে মৃত মানুষের শরীর কাটাছেঁড়া করতে হয়। মতিলাল চেয়েছিলেন রামপ্রসাদও পেশা হিসেবে লাশকাটা বেছে নিক। সে জন্য কিশোর বয়স থেকেই ছেলেকে লাশকাটা ঘরে নিয়ে যেতেন।

১৯৯১ সালে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ডোম হিসেবে চাকরিজীবন শুরু করেছিলেন রামপ্রসাদ। এর আগে টানা তিন বছর বাবা মতিলালের কাছে শিখেছেন কেমন করে মৃত মানুষের শরীর কাটাছেঁড়া করতে হয়। মতিলাল চেয়েছিলেন রামপ্রসাদও পেশা হিসেবে লাশকাটা বেছে নিক। সে জন্য কিশোর বয়স থেকেই ছেলেকে লাশকাটা ঘরে নিয়ে যেতেন।

প্রথম দিকে রামপ্রসাদ ভয়ে কুঁকড়ে যেতেন। কিন্তু মতিলাল তাঁকে অভয় দিয়ে বলতেন, ‘মরা মানুষের তো কিছু করার ক্ষমতা নেই। ভয় পাস না রে বাপ। এটা করেই চলতে হবে তোকে।’ ধীরে ধীরে রামপ্রসাদের ভয় কেটে গেল। তিনি এখন পুরোপুরি পেশাদার ডোম। তাঁর কর্মস্থল চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল। সকাল থেকে হাসপাতাল এলাকাতেই থাকেন। হাসপাতালে লাশ এলেই খবর পড়ে রামপ্রসাদের। তিনিও তড়িঘড়ি করে চলে আসেন মর্গে।

কে যেন পেছন পেছন আসছে
১৯৯১ সালে প্রথম লাশ কাটেন রামপ্রসাদ। মর্গে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এরপর হাতে ধারালো অস্ত্র তুলতেই বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। বাবার কাছ থেকে শেখার সময় কখনো এমন হয়নি। টেবিলের ওপর একজন মানুষ শুয়ে আছে। মৃত। তার বুকটা চিরে ফেলতে হবে। মাথার খুলিটা খুলে ফেলতে হবে। বুকের মধ্যে থুথু দিয়ে রামপ্রসাদ লাশের বুকে ধারালো চাকুর পোঁচ দেন। কিন্তু তাঁর মনে হলো হাতে যেন শক্তি নেই কিংবা চাকুতে ধার নেই। পরে ধারালো সেই চাকু দিয়ে আবার চেষ্টা করেন। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে গেছে। বুঝে ফেললেন, এসব কিছু নয়, মনের দুর্বলতা। শেষ পর্যন্ত সেদিন ভালোভাবেই কাজ শেষ করেছিলেন। তবে খুব ভয় পেয়েছিলেন রাতে বাসায় ফেরার পথে। রামপ্রসাদ বলেন, ‘একা একা চলতে গেলে ভয় করত। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর কিংবা রাতে। মনে হতো, কে যেন পেছন পেছন আসছে। ভয়ে ভয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখতাম কেউ নেই। যার শরীর কেটেছিলাম, সে কি ভূত হয়ে এলো! এখন ভয় করে না।’

এমন লাশ যেন কাটতে না হয়

১৫-১৬ বছর আগের ঘটনা। এক দিনেই ১৩টি লাশ কাটতে হয়েছিল। পিটিয়ে হত্যা এবং দুর্ঘটনায় লাশগুলো এসেছিল মর্গে। একসঙ্গে অনেক লাশ দেখার অভিজ্ঞতা কষ্ট দেয় রামপ্রসাদকে। বললেন, ‘সব লাশ কেটেছি একের পর এক। এত লাশ দেখে মন খারাপ হয়েছে খুবই।’
তবে রামপ্রসাদ এর চেয়েও বেশি কষ্ট পান যখন নিষ্পাপ কোনো শিশুর বুকে চাকু চালাতে হয়। ময়নাতদন্তের জন্য বুক চিরতে হবে, মাথার খুলি খুলতে হয়। চিকিৎসক আর যেসব জায়গা সন্দেহ করেন সেসবও কেটে দেখতে হয়। পরে চিকিৎসক সেসব বিশ্লেষণ করে ময়নাতদন্ত করেন। বললেন, ‘শিশুর বুকে ছুরি চালাতে গেলে বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। ভাবি, না জানি কোন মায়ের বুক খালি হলো। এখনো কোনো শিশু কিংবা পরিচিত কারো লাশ এলে মনটা বিষাদে ভরে ওঠে। মনে মনে প্রার্থনা করি, এমন লাশ আমাকে যেন কাটতে না হয়।’

পূর্বপুরুষের পেশা

তিন সন্তানের জনক রামপ্রসাদ। মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেছে। বড় ছেলে ব্যবসা করে। উত্তরাধিকার সূত্রে এই পেশায় এসেছেন রামপ্রসাদ। বললেন, ‘আমার দাদাও লাশ কাটতেন। ছোট ছেলে বিজয় কুমার এখন বাবার পথে হাঁটছে। কিন্তু নিজের ছেলেপুলে এই পেশায় আসুক তা চাননি রামপ্রসাদ। বললেন, ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়ার পর সে আর পড়ল না। বাধ্য হয়েই তাকে কাজ শেখাচ্ছি।

Spread the love
Facebook Comments

সাম্প্রতিক খবর

Contact Us