শিরোনাম

সেনা শাসনের দেশ মিয়ানমার

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : শনিবার, এপ্রিল ২৪, ২০২১ ১১:৩৬:২৪ পূর্বাহ্ণ
সেনা শাসনের দেশ মিয়ানমার
সেনা শাসনের দেশ মিয়ানমার

মো: গোলাম মোস্তফা-মোস্তাক বিশেষ প্রতিনিধি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগলোর মধ্যে মিয়ানমারই একমাত্র দেশ যারা স্বাধিনতার পর থেকে সব সময়ই পরোক্ষ্য অথবা প্রত্যক্ষভাবে সেনা শাসনের অধিনে আছে।

১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর ৫০ বছরের অধিক সময় প্রত্যক্ষভাবে এবং বাকী সময় পরোক্ষভাবে সামরিক শাসনের অধিনে থেকেছে দেশটি। ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ব্রিটিশ উপনিবেশ মিয়ানমারে (তৎকালীন বার্মা) অভিযান চালায় জাপান।

জাপানে প্রশিক্ষিত বার্মা ইন্ডিপেনডেন্ট আর্মির সহায়তায় দেশটি দখল করে নেয় তারা। বার্মা ইন্ডিপেনডেন্ট আর্মি পরবর্তীতে অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট পিপলস ফ্রিডম লীগে (এএফপিএফএল) রূপান্তরিত হয় এবং মিয়ানমারে জাপানি শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ১৯৪৫ সালে অং সানের নেতৃত্বাধীন এএফপিএফএল’র সহায়তায় জাপানি দখলদারিত্ব থেকে মিয়ানমারকে মুক্ত করে ব্রিটেন।

বার্মার স্বাধীনতার জন্য ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্বে দিয়েছিলেন জেনারেল অং সান, যাকে দেশটির সামরিক বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ব্রিটেনর কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের ছয মাস আগে প্রতিপক্ষের হাতে খুন হন অং সান। তবে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই বার্মার জনগণ সেনাবাহিনীকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতো, তাদের মনে করা হতো দেশের রক্ষাকারী হিসেবে।

অন্যদিকে, স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই বার্মায বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। দেশটিকে ঐক্যবদ্ধভাবে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনী গুরুত্বপুর্ন ভূমিকা পালন করেছে। নতুবা বার্মা ভেঙ্গে টুকরো-টুকরো হয় যেত বলে সেনাবাহিনী দাবি করে। মিয়ানমারের স্বাধিনতার দশ বছরের মাথায় ১৯৫৮ সালে ক্ষমতাসীন এএফপিএফএল-এ ভাঙন দেখা দিলে চিফ অব স্টাফ জেনারেল নে উইন এএফপিএফএল সরকারকে সরিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করেন।

১৯৬০ সালের নির্বাচনে এএফপিএফএল’র উ নু’র নেতৃত্বাধীন অংশ জয়ী হলে তার রাজনৈতিক নীতিমালা সেনাবাহিনীকে ক্ষুব্ধ করে। ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উ নু’র সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। সেসময় তিনি মিয়ানমারের ফেডারেল ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে ‘নিজস্ব ঘরানার সমাজতন্ত্র’ চালু করেন। পাশাপাশি তিনি অর্থনীতিকে জাতীয়করণ ও সোশ্যালিস্ট প্রোগ্রাম পার্টি নামে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করেন।

জেনারেল উইন দেশটিতে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমও নিষিদ্ধ করেন। ১৯৭৪ সালে দেশটিতে নতুন সংবিধান চালু হয়। সশস্ত্র বাহিনীর হাত থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা জেনারেল নে উইন ও অন্যান্য সাবেক সামরিক নেতাদের পরিচালিত পিপলস অ্যাসেম্বলির কাছে হস্তান্তর করা হয়। ১৯৮১ সালে জেনারেল নে উইন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল সান ইউয়ের কাছে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ছেড়ে দেন। তবে তিনি সোশ্যালিস্ট প্রোগ্রাম পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।

১৯৮৯ সালে মিয়ানমারে সামরিক আইন জারি করা হয়। সেসময় বার্মার নাম আনুষ্ঠানিকভাবে মিয়ানমার রাখার পাশাপাশি গণতন্ত্র ও মানবাধিকারপন্থি কয়েক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা অং সানের মেয়ে ও এনএলডি নেতা অং সান সু চিকে গৃহবন্দি করা হয়। ১৯৯০ সালে বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্রের পতনের পর মিয়ানমারে সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করা হয়।

বিরোধী এনএলডি নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হলে সেনাবাহিনী সে ফল উপেক্ষা করে। ২০১১ সালের মার্চে থিয়েন সেইন দেশটির নতুন ও বেসামরিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। সে বছরের আগস্টে তিনি সু চির সঙ্গে দেখা করেন। অক্টোবরে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে মুক্তি দেওয়া হয়।

২০১২ সালের এপ্রিলে পার্লামেন্টের উপ-নির্বাচনে সু চিসহ এনএলডির প্রার্থীরা জয় লাভ করেন। সেসময় ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক বছরের জন্য মিয়ানমারের ওপর থেকে সব বেসামরিক অবরোধ তুলে নেয়। ২০১৩ সালের এপ্রিলে পাঁচটি বেসরকারি দৈনিক পত্রিকার অনুমতি দেয় মিয়ানমার সরকার। প্রায় ৫০ বছর পর দেশটিতে বেসরকারি পত্রিকা অনুমতি পায়। ২০১৪ সালের অক্টোবরে সরকার ঘোষণা দেয় যে, ২০১৫ সালের শেষের দিকে মিয়ানমারে পার্লামেন্টারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

সেসময় সরকার ৩ হাজার বন্দিকে মুক্তি দেওয়ারও ঘোষণা দেয়। ২০১৫ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে সু চির নেতৃত্বাধীন বিরোধী এনএলডি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে জয় পায়। ২০১৬ সালের মার্চে হতিন কিয়াও প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিলে দেশটিতে নতুন যুগের সূচনা হয়। প্রায় ৫০ বছরের সেনা আধিপত্যের পর সু চির গণতান্ত্রিক আন্দোলন রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রভাব ফেলে।

১৯৬২ সালের অভ্যুত্থানের পর প্রায় ৫০ বছর ধরে সেনাবাহিনী সরাসরি শাসন করেছে। মিয়ানমারের ২০০৮ সালের সংবিধানের প্রণেতা হিসেবে, রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সেনাবাহিনী নিজেদের একটি স্থায়ী ভূমিকা নিশ্চিত করে রেখেছে। পার্লামেন্টের আসনে তারা অনির্বাচিত ২৫ শতাংশ কোটা এবং এর প্রধান প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র এবং সীমান্ত বিষয়ক মন্ত্রী নিয়োগের ক্ষমতা রেখে রাজনীতিতে তাদের ভূমিকা পাকাপোক্ত করে যেখানে দেশটির সেনাপ্রধান নিজেই নিজের বস তিনি কারও কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নন।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অবস্থিত লোয়ি ইন্সটিটিউট-এর পূর্ব এশিয়া বিষয়ক গবেষক অ্যারন কনেলি ২০১৭ সালে সিএনএন-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনটা বলেছিলেন: “মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে যদি বলা হয়, দেশের ভেতরে নিয়ন্ত্রণ নাকি আন্তর্জাতিক সম্মান – তোমরা কোনটি চাও? তারা দেশ নিয়ন্ত্রণ করাটাকেই বেছে নেবে।” মি. কনেলি বলেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী বেসামরিক রাজনীতিবিদদের হাতে ক্ষমতা পুরোপুরি ছেড়ে দিতে মোটেও রাজী নয়।

মিয়ানমারের সামরিক শাসন নিয়ে গবেষণা করেছেন জার্মানির গিগা ইন্সটিটিউট অব এশিয়ান স্টাডিজের গবেষক ম্যাক্রো বুন্তা। বার্মা প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, স্বাধীনতা লাভের ছয় বছর আগেই বার্মিজ সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দেশটির স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বেও ছিল দেশটির সেনাবাহিনী।

ফলে বার্মিজ সেনাবাহিনীর অফিসার এবং সৈনিকদের মধ্যে রাজনৈতিক মনোভাব শুরু থেকেই ছিল বলে তিনি মনে করেন। স্বাধীনতার পরে দেশের ভেতরে জাতিগত সং

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Facebook Comments

সাম্প্রতিক খবর

Contact Us